১২:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ০৮ জুলাই ২০২৬, ২৩ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

মিরপুর ছাড়ছেন অনেকে পানির জন্য ‘হাহাকার’,

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০৮:৩৯:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬ ১৭ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে মেট্রোরেল। মেট্রোরেল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে জনপ্রিয় এই গণপরিবহন। মেট্রোরেলের সুবিধাভোগী এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম মিরপুর। মেট্রোরেল চালুর পর মিরপুরের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, দিনে দিনে বসবাসের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। চাহিদার কারণে মিরপুরে একের পর এক গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক-বাণিজ্যিক ভবন। ফলে শহরের কর্মজীবী মানুষ এই এলাকায় বাসা নিতে আগ্রহ দেখাতেন।

তবে নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এলাকাটিতে এখন অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। স্থানীয়রা বলছেন, মিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াসার পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন সেকশনসহ পল্লবী, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আশপাশের অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি এই পরিস্থিতি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোথাও নির্ধারিত সময়ে পানি আসে না, আবার কোথাও এত কম চাপ থাকে যে মোটর চালিয়েও পর্যাপ্ত পানি তোলা সম্ভব হয় না।

এই সংকট শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছোট ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, মসজিদ এবং বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানও পানির অভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। এমন অবস্থায় নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির অভাব দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত এবং সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চাহিদার তুলনায় দিনে ২৫ কোটি লিটার কম পানি উৎপাদন করছে ঢাকা ওয়াসা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানির সংকটে স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে শিশু ও বয়স্কদের প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে পানির জার কিনছে অথবা বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছে। এতে তাদের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এছাড়া পানি সংকটের কারণে অনেকেই মিরপুর ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নিচ্ছেন।

তবে ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্টরা জানান, মেট্রোরেল চালুর পর শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও আশপাশে নতুন নতুন বহুতল ভবন হয়েছে। বেড়েছে ভাড়াটে ও স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পানির চাহিদা। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহব্যবস্থা বাড়ানো যায়নি। এর মধ্যে সম্প্রতি সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর এলাকায় এক মাসের বেশি সময় ধরে তীব্র পানির সংকট চলছে। ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা) চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারায় তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছেন এলাকাবাসী। অন্যদিকে ওয়াসার পুরোনো নলকূপগুলোর সক্ষমতা কমে আসার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আগামী দিনগুলোয় মিরপুরে পানি সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বেসরকারি চাকরিজীবী মোস্তাক আহমেদ পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন কাজীপাড়া এলাকায়। তার অফিস মতিঝিলে। মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর যাতায়াতের ভোগান্তি কমেছে, জীবনযাত্রা হয়েছে অনেকটাই সহজ। কিন্তু তীব্র পানির সংকট যেন সে স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। এখন মাসের বেশিরভাগ সময়ই লাইনে পানি থাকে না।’

মিরপুরের বাইশবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, ‘বাসায় গত দুই মাস ধরে ঠিকমতো পানি পাওয়া যায় না। বিকল্প ব্যবস্থায় পানি সংগ্রহ করে বাসার দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে হয়। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। নিয়মিত গোসলও করাতে পারছি না। এভাবে পানি ছাড়া আর কয়দিন চলতে হবে জানি না।’

ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ভাকুর্তা শোধনাগার থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। এ পানি মূলত বৃহত্তর মিরপুরে যায়। তাই সরবরাহে সামান্য ঘাটতি হলে এর বড় চাপ পড়ে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মনিপুর ও আশপাশের এলাকায়। আগে থেকেই যেসব এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল, সেখানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

 

এর মধ্যে গত ২০ জুন শোধনাগারের ট্রান্সফর্মার ও জেনারেটরে ত্রুটি দেখা দেয়। ওইদিন মাত্র ৭ কোটি লিটার পানি পাওয়া যায়। পরের দুদিনের প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার করে পানি সরবরাহ করা হয়। ফলে তিনদিনে স্বাভাবিকের তুলনায় মোট ৯ কোটি লিটার পানি কম সরবরাহ হয়েছে।

পানি নিয়ে এই অভিযোগের ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘মিরপুর অঞ্চলে পানি সংকট, বিষয়টি এমন নয়। গত ২০ থেকে ২৩ জুন চারদিন সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ওই চারদিনই পানির কিছুটা সংকট ছিল। তারপর থেকে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক। কিন্তু স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, পানি সংকট প্রচুর। তাই তারা লাইনে যখন পানি দেখেন, মুহূর্তে মোটর দিয়ে সব বাড়ির মালিক পানি টেনে নেন। এতে বাইশবাড়ীসহ আশপাশের কিছু এলাকায় সড়কের শেষ মাথার বাড়িগুলোতে পানি পাওয়া যায় না। আবার গলির মাথায় যেখানে পানির প্রেশার বেশ কম থাকে, সেখানে পানি পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে।’

পানি সংকট থেকে এই এলাকার মানুষের মুক্তি মিলবে কবে জানতে চাইলে এমদাদুল হক বলেন, ‘কাজীপাড়ায় তিন নম্বর পাম্পের যে বোরিংয়ের কাজ চলছে, তা আগামী সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। আরও কয়েকটি ভূগর্ভস্থ পানির পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। তবে এখন জনগণের প্রতি আহ্বান থাকবে, চাহিদার চেয়েও বেশি পানি কেউ যেন সংরক্ষণ না করে। যতটুকু পানি দরকার, সবাই যেন সে পরিমাণ পানি টানে।’

 

মিরপুর অঞ্চলে মানুষের চাপ বাড়ায় পানি সংকটের অন্যতম একটা কারণ জানিয়ে ওয়াসার এই প্রকৌশলী বলেন, ‘কাজীপাড়া বা মিরপুর-১০ এর যে কোনো একটি বহুতল ভবনের ছাদে দাঁড়ালে দেখা যাবে, শত শত নতুন আবাসিক বাণিজ্যিক ভবন গড়ে উঠেছে। কিন্তু ওই এলাকায় পানির পাম্প বসানোর জন্য কেউ জায়গা দিচ্ছে না।’

ওয়াসা সূত্র জানায়, ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। এই চাহিদা মেটাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা ওয়াসা স্থাপন করেছে প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ, যার মধ্যে শুধু মিরপুর জোনেই রয়েছে প্রায় ১৮০টি। কিন্তু তারপরও পানি চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না ওয়াসা। ফলে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর ও পীরবাগের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তীব্র হয় সংকট।

গত ২৮ জুন পানির সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে শেওড়াপাড়ার শতাধিক বাসিন্দা বালতি ও বোতল নিয়ে মূল সড়ক অবরোধ করেন। তারা প্রায় ২০ মিনিট সেখানে অবস্থান করেন। পরে রাতের মধ্যে পানি দেওয়ার আশ্বাস পেয়ে সড়ক ছেড়ে দেন। কিন্তু আজ ৭ জুলাই পর্যন্ত পানি সংকট কাটেনি।

ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। এই চাহিদা পূরণে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। পাশাপাশি নদীর পানি শোধন করেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

ওয়াসার জনতথ্য বিভাগের উপ-প্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘বছরের অন্যান্য সময় যে পরিমাণ পানি মিরপুর অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়, এখন ঠিক সে পরিমাণ পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে গ্রীষ্মকালে বাসাবাড়িতে পানির চাহিদা বেশি থাকে। তখনই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এতে পানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। শিগগির পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে যাবে।’

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

মিরপুর ছাড়ছেন অনেকে পানির জন্য ‘হাহাকার’,

আপডেট সময় : ০৮:৩৯:৪২ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

রাজধানীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় আশীর্বাদ হয়ে এসেছে মেট্রোরেল। মেট্রোরেল সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দাদের যাতায়াত ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন এনেছে জনপ্রিয় এই গণপরিবহন। মেট্রোরেলের সুবিধাভোগী এলাকাগুলোর মধ্যে অন্যতম মিরপুর। মেট্রোরেল চালুর পর মিরপুরের বাসিন্দাদের জীবনযাত্রায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে, দিনে দিনে বসবাসের অন্যতম গন্তব্যে পরিণত হয়েছে। চাহিদার কারণে মিরপুরে একের পর এক গড়ে উঠেছে বহুতল আবাসিক-বাণিজ্যিক ভবন। ফলে শহরের কর্মজীবী মানুষ এই এলাকায় বাসা নিতে আগ্রহ দেখাতেন।

তবে নগরবাসীর কাছে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা এলাকাটিতে এখন অভিশাপ হয়ে দেখা দিয়েছে পানির সংকট। স্থানীয়রা বলছেন, মিরপুরে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াসার পানির সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন সেকশনসহ পল্লবী, কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া ও আশপাশের অনেক এলাকায় পর্যাপ্ত পানি পাওয়া যাচ্ছে না। সম্প্রতি এই পরিস্থিতি আরও প্রকট আকার ধারণ করেছে। কোথাও নির্ধারিত সময়ে পানি আসে না, আবার কোথাও এত কম চাপ থাকে যে মোটর চালিয়েও পর্যাপ্ত পানি তোলা সম্ভব হয় না।

এই সংকট শুধু বাসাবাড়িতেই সীমাবদ্ধ নয়; শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ছোট ব্যবসা, রেস্তোরাঁ, মসজিদ এবং বিভিন্ন সেবাপ্রতিষ্ঠানও পানির অভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় হিমশিম খাচ্ছে। এমন অবস্থায় নিরাপদ ও পর্যাপ্ত পানির অভাব দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি ও ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা ব্যাহত এবং সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চাহিদার তুলনায় দিনে ২৫ কোটি লিটার কম পানি উৎপাদন করছে ঢাকা ওয়াসা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পানির সংকটে স্থানীয়দের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। রান্না, গোসল, কাপড় ধোয়া থেকে শুরু করে শিশু ও বয়স্কদের প্রয়োজনীয় পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখাও কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে পানির জার কিনছে অথবা বিকল্প উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করছে। এতে তাদের মাসিক ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এছাড়া পানি সংকটের কারণে অনেকেই মিরপুর ছেড়ে অন্যত্র বাসা ভাড়া নিচ্ছেন।

তবে ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্টরা জানান, মেট্রোরেল চালুর পর শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া ও আশপাশে নতুন নতুন বহুতল ভবন হয়েছে। বেড়েছে ভাড়াটে ও স্থায়ী বাসিন্দার সংখ্যা। সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে পানির চাহিদা। কিন্তু চাহিদার তুলনায় সরবরাহব্যবস্থা বাড়ানো যায়নি। এর মধ্যে সম্প্রতি সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মিরপুরের কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর এলাকায় এক মাসের বেশি সময় ধরে তীব্র পানির সংকট চলছে। ঢাকা পানি সরবরাহ ও পয়োনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষ (ঢাকা ওয়াসা) চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে না পারায় তীব্র ভোগান্তিতে পড়েছেন এলাকাবাসী। অন্যদিকে ওয়াসার পুরোনো নলকূপগুলোর সক্ষমতা কমে আসার পাশাপাশি ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় আগামী দিনগুলোয় মিরপুরে পানি সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

 

বেসরকারি চাকরিজীবী মোস্তাক আহমেদ পরিবার নিয়ে ভাড়া থাকেন কাজীপাড়া এলাকায়। তার অফিস মতিঝিলে। মোস্তাক আহমেদ বলেন, ‘মেট্রোরেল চালু হওয়ার পর যাতায়াতের ভোগান্তি কমেছে, জীবনযাত্রা হয়েছে অনেকটাই সহজ। কিন্তু তীব্র পানির সংকট যেন সে স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে। এখন মাসের বেশিরভাগ সময়ই লাইনে পানি থাকে না।’

মিরপুরের বাইশবাড়ী এলাকার বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, ‘বাসায় গত দুই মাস ধরে ঠিকমতো পানি পাওয়া যায় না। বিকল্প ব্যবস্থায় পানি সংগ্রহ করে বাসার দৈনন্দিন কাজকর্ম করতে হয়। বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে অনেক কষ্টে আছি। নিয়মিত গোসলও করাতে পারছি না। এভাবে পানি ছাড়া আর কয়দিন চলতে হবে জানি না।’

ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, ভাকুর্তা শোধনাগার থেকে স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন প্রায় ১২ কোটি লিটার পানি সরবরাহ করা হয়। এ পানি মূলত বৃহত্তর মিরপুরে যায়। তাই সরবরাহে সামান্য ঘাটতি হলে এর বড় চাপ পড়ে শেওড়াপাড়া, কাজীপাড়া, মনিপুর ও আশপাশের এলাকায়। আগে থেকেই যেসব এলাকায় চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম ছিল, সেখানে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে।

 

এর মধ্যে গত ২০ জুন শোধনাগারের ট্রান্সফর্মার ও জেনারেটরে ত্রুটি দেখা দেয়। ওইদিন মাত্র ৭ কোটি লিটার পানি পাওয়া যায়। পরের দুদিনের প্রতিদিন ১০ কোটি লিটার করে পানি সরবরাহ করা হয়। ফলে তিনদিনে স্বাভাবিকের তুলনায় মোট ৯ কোটি লিটার পানি কম সরবরাহ হয়েছে।

পানি নিয়ে এই অভিযোগের ব্যাপারে ঢাকা ওয়াসার মডস জোন-৪ এর নির্বাহী প্রকৌশলী মো. এমদাদুল হক বলেন, ‘মিরপুর অঞ্চলে পানি সংকট, বিষয়টি এমন নয়। গত ২০ থেকে ২৩ জুন চারদিন সাভারের ভাকুর্তা পানি শোধনাগারে যান্ত্রিক ত্রুটি দেখা দেয়। ওই চারদিনই পানির কিছুটা সংকট ছিল। তারপর থেকে পানি সরবরাহ স্বাভাবিক। কিন্তু স্থানীয়দের অনেকেই মনে করছেন, পানি সংকট প্রচুর। তাই তারা লাইনে যখন পানি দেখেন, মুহূর্তে মোটর দিয়ে সব বাড়ির মালিক পানি টেনে নেন। এতে বাইশবাড়ীসহ আশপাশের কিছু এলাকায় সড়কের শেষ মাথার বাড়িগুলোতে পানি পাওয়া যায় না। আবার গলির মাথায় যেখানে পানির প্রেশার বেশ কম থাকে, সেখানে পানি পৌঁছাতে কিছুটা সময় লাগে।’

পানি সংকট থেকে এই এলাকার মানুষের মুক্তি মিলবে কবে জানতে চাইলে এমদাদুল হক বলেন, ‘কাজীপাড়ায় তিন নম্বর পাম্পের যে বোরিংয়ের কাজ চলছে, তা আগামী সপ্তাহের মধ্যে শেষ হবে। আরও কয়েকটি ভূগর্ভস্থ পানির পাম্প স্থাপনের কাজ চলছে। তবে এখন জনগণের প্রতি আহ্বান থাকবে, চাহিদার চেয়েও বেশি পানি কেউ যেন সংরক্ষণ না করে। যতটুকু পানি দরকার, সবাই যেন সে পরিমাণ পানি টানে।’

 

মিরপুর অঞ্চলে মানুষের চাপ বাড়ায় পানি সংকটের অন্যতম একটা কারণ জানিয়ে ওয়াসার এই প্রকৌশলী বলেন, ‘কাজীপাড়া বা মিরপুর-১০ এর যে কোনো একটি বহুতল ভবনের ছাদে দাঁড়ালে দেখা যাবে, শত শত নতুন আবাসিক বাণিজ্যিক ভবন গড়ে উঠেছে। কিন্তু ওই এলাকায় পানির পাম্প বসানোর জন্য কেউ জায়গা দিচ্ছে না।’

ওয়াসা সূত্র জানায়, ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। এই চাহিদা মেটাতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় ঢাকা ওয়াসা স্থাপন করেছে প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ, যার মধ্যে শুধু মিরপুর জোনেই রয়েছে প্রায় ১৮০টি। কিন্তু তারপরও পানি চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ করতে পারছে না ওয়াসা। ফলে কাজীপাড়া, শেওড়াপাড়া, মনিপুর ও পীরবাগের মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় তীব্র হয় সংকট।

গত ২৮ জুন পানির সংকটে ক্ষুব্ধ হয়ে শেওড়াপাড়ার শতাধিক বাসিন্দা বালতি ও বোতল নিয়ে মূল সড়ক অবরোধ করেন। তারা প্রায় ২০ মিনিট সেখানে অবস্থান করেন। পরে রাতের মধ্যে পানি দেওয়ার আশ্বাস পেয়ে সড়ক ছেড়ে দেন। কিন্তু আজ ৭ জুলাই পর্যন্ত পানি সংকট কাটেনি।

ঢাকা ওয়াসা সূত্র বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন পানির চাহিদা প্রায় ৩০০ কোটি লিটার। এই চাহিদা পূরণে ঢাকা ওয়াসা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৩৫০টি গভীর নলকূপ স্থাপন করেছে। পাশাপাশি নদীর পানি শোধন করেও সরবরাহ করা হচ্ছে।

ওয়াসার জনতথ্য বিভাগের উপ-প্রধান জনতথ্য কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের বলেন, ‘বছরের অন্যান্য সময় যে পরিমাণ পানি মিরপুর অঞ্চলে সরবরাহ করা হয়, এখন ঠিক সে পরিমাণ পানি দেওয়া হচ্ছে। তবে গ্রীষ্মকালে বাসাবাড়িতে পানির চাহিদা বেশি থাকে। তখনই ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যায়। এতে পানি সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেয়। শিগগির পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে যাবে।’