ফিফা বিশ্বকাপ
মেসির আনন্দাশ্রু, শেষ আটে আর্জেন্টিনা
- আপডেট সময় : ১২:৫৫:৩৯ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬ ১৩ বার পড়া হয়েছে

মেসির পেনাল্টি মিসে ছিল অশনি সংকেত। চীনের প্রাচীর হয়ে গোলবার আগলে রেখে আর্জেন্টিনাকে একটার পর একটা গোল বঞ্চিত করেছেন মিশরের গোলরক্ষক। এই দেয়াল একটা পর্যায়ে আর্জেন্টিনার আশা ভরসা প্রায় শেষ করে দিয়েছিল। তবে এমন এক ম্যাচের কি শ্বাসরুদ্ধকর পরিসমাপ্তিই না দেখল আর্জেন্টিনা সমর্থকরা। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ০-২ গোলে মিশরের এগিয়ে থাকাটা যেনো মৌচাকে ঢিল ছোঁড়ার মতো হয়েছে। মাত্র ১৪ মিনিটের মধ্যে এক এক করে তিন গোল। তাতেই ৩-২ গোলে জিতে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা।
আর্জেন্টিনার শ্বাসরুদ্ধকর এই জয়ের নায়ক মেসিকে ম্যাচ শেষে শুণ্যে উচিঁয়ে টিমমেটরা করেছে উৎসব।
৪-৪-২ ফরমেশনে বলের নিয়ন্ত্রন ৬৪% নিয়ে, ৫টি বড় সুযোগ হারিয়েও শেষ হাসি হেসেছে আর্জেন্টিনা। বিশ্বকাপে এইপ্রথম মিশরকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে পেয়ে কঠিন পরীক্ষা দিতে হয়েছে স্কলানির দলকে।
ফরোয়ার্ডে মেসির পার্টনার লাউতারো মার্টিনেজের জায়গায় এদিন আলভারেজকে নামিয়েও প্রথমার্ধে মিশরের ডিফেন্সে তেমন ফাটল ধরাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। মিড ফিল্ডে পেদ্রেজ ছাড়া আক্রমনের উৎস তৈরি করতে পারেনি মাঝমাঠের অন্য তিন খেলোয়াড়। ম্যাক অ্যালিস্টারকে শুরু থেকেই নিষ্প্রভ দেখা গেছে।
বিপরীতে একই ফরমেশনকে বেছে নেয়া মিশর প্রথমার্ধে দুই মিড ফিল্ডার আত্তিয়া এবং আসুরের উপর নির্ভর ছিল। প্রথমার্ধে একটি মাত্র আক্রমন থেকে প্রাপ্ত কর্নার কিককে গোলে পরিণত করেছে মিশর। খেলার ১৫তম মিনিটে আত্তিয়ার কর্নার থেকে দারুণ হেডে গোল করেছেন ইয়াসির আহমেদ ইব্রাহিম এল হানাফি (১-০)। আত্তিয়ার কর্নার থেকে দ্বিতীয় পোষ্টে উড়ে আসা বল লাফিয়ে হেড করে বিপদমুক্ত করতে পারেননি আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডার লিসান্দ্রো মার্তিনেজ। তাঁর সঙ্গে স্পট হেডে পাল্লা দিয়ে নিখুঁত হেডে গোল করেন ইয়াসির।
২০২২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচের (সৌদি আরবের বিপক্ষে) পর এই প্রথম আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপে কোনো ম্যাচে পিছিয়ে পড়েছে। এই ম্যাচের আগে বিশ্বকাপে ১০টি ম্যাচের কোনোটিতেই তারা পিছিয়ে ছিল না।
খেলার ১৯তম মিনিটে সমতার সুযোগ হাতছাড়া করেন মেসি। ফার্নান্দেজের কাছ থেকে বল পেয়ে তাগলিয়াফিকো ডি বক্সে বিপজ্জনকভাবে ঢুকে পড়লে আর্জেন্টিনার এই লেফট-ব্যাককে মিশরের হাসান ফাউল করেন! রেফারির সিদ্ধান্তে আর্জেন্টিনা পায় পেনাল্টি। তবে মেসির নেয়া পেনাল্টি শট মিশর গোলরক্ষক শোবেইর বাঁ দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে মেসি এবং আর্জেন্টিনাকে গোল বঞ্চিত করেন।
বিশ্বকাপে এটি মেসির নেয়া ৮ম পেনাল্টি শটের মধ্যে ৪র্থ পেনাল্টি মিসের ঘটনা। বিশ্বকাপ ইতিহাসে প্রথম কোনো খেলোয়াড় যিনি এক আসরে দুটি পেনাল্টি মিস করেছেন (দুটিই শুটআউট বাদে)। ১৯১৮ বিশ্বকাপে তাঁর শট আইসল্যান্ডের গোলরক্ষক হানেস হ্যালডোরসন বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন। ২০২২ বিশ্বকাপে পোল্যান্ড গোলরক্ষক ভয়চেখ শেজনি বাঁচিয়ে দেন। চলমান বিশ্বকাপে অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে পেনাল্টি মিস করেছেন গোলপোষ্টের বাইরে মেরে। মঙ্গলবার মিশরের গোলক্ষক মোস্তফা শোবেইর মেসির নেয়া পেনাল্টি শট করেছেন প্রতিহত।
এই পেনাল্টি মিসের পরও প্রথমার্ধে তিনবার সমতার সুযোগ হাতছাড়া করেছে আর্জেন্টিনা। খেলার ২৮তম মিনিটে ডি পলের কাছ থেকে মাঝমাঠে বল পেয়ে ম্যাক অ্যালিস্টার মিশরের এক ডিফেন্ডারকে ডজে পরাস্ত করে দুর্দান্ত ক্রস করেন, কিন্তু লিভারপুলের এই মিডফিল্ডারের হেড সরাসরি শোবেইরের হাতে চলে যায়! এর তিন মিনিট পর প্রায় ৩০ গজ দূর থেকে মেসির নেয়া রেইনবো ফ্রি কিক বাঁ পোস্টে লেগে ফিরে আসে! খেলার ৩৯তম মিনিটে মিশরের গোলরক্ষক শোবেইর আবারও বাঁচালেন দলকে! তাগলিয়াফিকোর কাট-ব্যাক থেকে প্রথম স্পর্শেই আলভারেজের শটটি গোললাইন অতিক্রম করার সময়ে বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে গোলরক্ষক দুর্দান্ত সেভ করেন!
খেলার দ্বিতীয়ার্ধে আর্জেন্টিনার এলোমেলো ডিফেন্সের সুযোগ নিয়ে কাউন্টার অ্যাটাকগুলো ভয়ংকর করেছে মিশর।
খেলার ৫৮ মিনিটে মিশরের হাসান ডান প্রান্ত দিয়ে দুর্দান্তভাবে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে আর্জেন্টিনার, দুজন খেলোয়াড়কে ডজে পরাস্ত করে সালাহকে দিয়েছিলেন পাস। সালাহ থেকে জিকো দারুণ ফিনিশিং করেছিলেন। তবে শট নেওয়ার আগে লিসান্দ্রো মার্টিনেজকে ফাউল করায় ভিডিও অ্যাসিস্টেন্ট রেফারি (ভার) এ রিপ্লে দেখে গোলটি বাতিল করেন রেফারি।
খেলার ৬৭ মিনিটের মাথায় মিশর ব্যবধান দ্বিগুন করে। জিকো পাল্টা আক্রমণে আবারও গোল করলেন! সালাহ’র কাউন্টার অ্যাটাক থেকে হাসানকে দিয়েছেন কাট-ব্যাক। সেই পাস পেয়ে জিকো দলের পক্ষে দ্বিতীয় গোল করেন (২-০)।
দুই গোলে পিছিয়ে পড়ে মাত্র ৪ মিনিটের মধ্যে ওই দুই গোল পরিশোধ করেছে আর্জেন্টিনা। খেলার ৭৯ মিনিটের মাথায় মেসির নিখুঁত ক্রস থেকে রোমেরোর হেড মিশর গোলরক্ষক শোবেইরের গ্লোভসে লেগে জাল স্পর্শ করে (১-২)। ৪ মিনিট পর ডি বক্সে জটলার মধ্যে মিশরের ডিফেন্স বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে মন্তিয়েল গোলমুখে শট নেওয়ার জন্য মেসিকে বল সাজিয়ে দেন। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক প্রথম স্পর্শেই শট নিতে কোনো ভুল করেননি, যে শটটি ক্রসবারে লেগে শোবেইরের পায়ে লেগে জালে জড়ায় ( ২-২)। বিশ্বকাপের চলমান আসরে এটি মেসির ৮ম গোল।
খেলার ইনজুরি টাইমের দ্বিতীয় মিনিটে মিশরের আক্রমন থেকে সালহকে আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডারের ফাউল রেফারির চোখ এড়িয়ে গেলে কাউন্টার অ্যাটাক থেকে এনজো ফার্নান্দেজ আর্জেন্টিনার পক্ষে জয়সূচক গোল করেন (৩-২)। এই গোলে আর্জেন্টিনা উঠে গেল কোয়ার্টার ফাইনালে। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ০-২ গোলে পিছিয়ে পড়ে শেষ ১৩ মিনিটে ৩ গোলে রাউন্ড অব সিক্সটিনের বাধা পেরিয়েছে আর্জেন্টিনা। মেসি নিজে একটি গোল করেছেন, ১ টি গোলে অ্যাসিস্ট করেছেন। তাতেই বড় বাধা পেরিয়েছে আর্জেন্টিনা। সে কারণেই ম্যাচ শেষে মেসির আনন্দাশ্রু দেখেছে বিশ্ব এই ম্যাচে ফ্রান্সের রেফারি ফ্রাঁসোয়া লেটেক্সিয়ার ম্যাচ পরিচালনায় বার বার অসন্তোষ প্রকাশ করেছে মিশর ফুটবল দল। আর্জেন্টিনা খেলোয়াড়দের আপীলে ভার-এ চেক করে মিশরের একটি গোল বাতিল করলেও মিশরের একটি আপীলও গ্রহন করেননি এই রেফারি।

























