আলোচনায় আছেন কারা?
মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি, মহাসচিব কে?
- আপডেট সময় : ০৫:২৫:০৮ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১২ অগাস্ট ২০২৬ ১০ বার পড়া হয়েছে

জল্পনাকল্পনার অবসান ঘটিয়ে দেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতি হচ্ছেন বিএনপি মহাসচিব; স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই। দলীয়ভাবে তাঁর মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত। মির্জা ফখরুল মহাসচিব পদ ছেড়ে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব কে হবেন-এখন তা নিয়েই দলের ভিতর-বাইরে চলছে জোর আলোচনা। অবশ্য প্রথমে বিএনপির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পেতে পারেন।
পরবর্তী সময়ে চলতি বছরের শেষে বা আগামী বছরের শুরুতে জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে কাউকে দলটির পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হতে পারে।
দলীয় সূত্র জানিয়েছে, নতুন সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে চারজন নেতার নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে। তাঁরা হলেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ ও ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ও যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি। তাঁদের মধ্য থেকে একজন পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হতে পারেন।
অবশ্য সরকার থেকে দলকে আলাদা রাখার চিন্তাভাবনাও করছেন প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সে ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী পদে থাকা নেতাদের পরিবর্তে সাংগঠনিকভাবে দক্ষ ও ত্যাগী যোগ্য নেতাকে বেছে নিতে পারেন তিনি।
এদিকে সংবিধান অনুযায়ী আগামীকাল বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আগে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপি মহাসচিবের পদ থেকে পদত্যাগ করবেন। এরপর দলীয় গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হবেন।
এখন আলোচনা চলছে কে হবেন পরবর্তী মহাসচিব।
জানতে চাইলে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘মহাসচিব নিয়ে কী হচ্ছে জানা নেই। তবে আমি দলের প্রতি শতভাগ আনুগত্য প্রকাশ করেই কাজ করছি। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশেই ক্রান্তিকালে দলের নেতা-কর্মীদের পাশে দাঁড়িয়েছিলাম। যা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
দল আমাকে কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেটা বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং দলের নীতিনির্ধারকরাই ঠিক করবেন। ’
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা জানান, ২০০৯ সালে বিএনপির পঞ্চম জাতীয় কাউন্সিলে সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হয়েছিলেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। পরে ২০১১ সালে দলের তৎকালীন মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনের মৃত্যুর পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মির্জা ফখরুলকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব দেন। ২০১৬ সালের ষষ্ঠ জাতীয় কাউন্সিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিএনপির মহাসচিব নির্বাচিত হন। সাধারণত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিবকে পরবর্তী মহাসচিব মনে করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় প্রথমে মির্জা ফখরুলের মতো রুহুল কবির রিজভীকেও ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা বেশি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, নতুন মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন। রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে তাঁর দক্ষতা এবং দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় তিনি সম্ভাব্য মহাসচিব হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন। একই সঙ্গে আলোচনায় রয়েছেন স্থায়ী কমিটির অপর সদস্য ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন। তিনি বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন প্রয়াত বেগম খালেদা জিয়ার ব্যক্তিগত চিকিৎসক ছিলেন। দলের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, তৃণমূল এবং সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে দীর্ঘ সম্পৃক্ততা তাঁকে সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রেখেছে।
এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীও রয়েছেন আলোচনায়। দীর্ঘদিন দলের দপ্তর ও সাংগঠনিক কার্যক্রম সামলানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে রিজভীর। দলের দুঃসময়ে নিয়মিত ব্রিফিং ও মাঠের রাজনীতিতে সক্রিয় থাকায় তৃণমূলেও তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। তাই দলের সম্ভব্য মহাসচিব পদে তাঁর নাম বিশেষভাবে আলোচিত।
অন্যদিকে বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানিও রয়েছেন বিবেচনায়। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে তাঁর ধারাবাহিক সম্পৃক্ততা রয়েছে। তিনি দলের নীতি ও আদর্শের প্রতি অনুগত থেকে বিভিন্ন সাংগঠনিক দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছেন। সাংগঠনিক সংকট মোকাবিলা, কর্মী-সমর্থকদের একত্র রাখা এবং আন্দোলনকে গতিশীল করার ক্ষেত্রে তাঁর দক্ষতা প্রমাণিত।
বিএনপির সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার গঠনের আগে বিএনপির মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আলোচনায় এগিয়ে থাকা নেতাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও সালাহউদ্দিন আহমদ। গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিয়ে সরকারে তাঁরা এখন অত্যন্ত ব্যস্ত সময় পার করছেন। সে তুলনায় রিজভীর ব্যস্ততা কিছুটা কম। তিনি দীর্ঘদিন ধরে বিএনপির কেন্দ্রীয় রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছেন। দলীয় কর্মসূচি, সংবাদ সম্মেলন, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সাংগঠনিক যোগাযোগে তাঁর অবদান রয়েছে। সবকিছু মিলিয়ে মির্জা ফখরুলের উত্তরসূরি হিসেবে রিজভীর নামই সামনে আসছে। যদিও বিষয়টি এখনো চূড়ান্ত হয়নি। বিএনপিতে আলোচনা আছে, মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। সরকার থেকে দলকে আলাদা করে পরিচালনা করা হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীসহ অন্যান্য পদপদবিধারীদের পরিবর্তে দল পরিচালনায় বেশি সময় দেওয়ার সুবিধার্থে শুধু দলীয় দায়দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। এ ক্ষেত্রে দলের মহাসচিবের দায়িত্ব তখন শুধু সাংগঠনিক বিষয় নয়, সরকারের সঙ্গে দলীয় সমন্বয় এবং মাঠপর্যায়ের রাজনীতিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এ অবস্থায় রিজভীকে দায়িত্ব দেওয়া হলে দলের দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ হিসেবে তিনি সংগঠনের ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারবেন।
আবার ডা. জাহিদও দলের হাইকমান্ডের কাছে আস্থাভাজন একজন নেতা। পেশাজীবী সংগঠন ড্যাবের সফল নেতৃত্বের পর দলের চেয়ারপারসনের উপদেষ্টার দায়িত্বে থাকাকালে দুঃসময়ে অসুস্থ চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার পাশে থেকে চিকিৎসা ব্যবস্থাপনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন। একই সঙ্গে দলের ভিতর ও বাইরেও তাঁর ত্যাগী ও সজ্জন ইমেজও রয়েছে। তাঁকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীর দায়িত্ব থেকে সরিয়ে মহাসচিব করারও গুঞ্জন রয়েছে।
কাউন্সিল, নাকি তারেক রহমানের সিদ্ধান্ত : মির্জা ফখরুলের স্থলাভিষিক্ত হিসেবে কে মহাসচিব হবেন তা নির্ধারণে বিএনপির সামনে একাধিক পথ খোলা রয়েছে। দলের কাউন্সিল ডেকে নতুন মহাসচিব নির্বাচন করা হতে পারে। আবার বর্তমান রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতায় কাউন্সিলের আগেই দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান সরাসরি কাউকে মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব দিতে পারেন। গঠনতন্ত্রে সে ক্ষমতা দলের চেয়ারম্যানের রয়েছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, মির্জা ফখরুল রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই স্থায়ীভাবে নতুন মহাসচিব নিয়োগ না করা পর্যন্ত গঠনতন্ত্র অনুযায়ী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী দায়িত্ব পালন করবেন। তবে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পাওয়া এবং পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব হওয়া দুটি আলাদা বিষয়। রিজভী অন্তর্বর্তী দায়িত্ব পেলেও পরবর্তী সময়ে কাউন্সিল বা তারেক রহমানের সিদ্ধান্তে যে কাউকে পূর্ণাঙ্গ মহাসচিব করা হতে পারে। চলতি বছরের শেষে বা আগামী বছরের শুরুতে বিএনপির জাতীয় কাউন্সিল অনুষ্ঠিত হতে পারে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের নাম নিয়ে যত আলোচনা থাকুক, শেষ পর্যন্ত বিএনপির নতুন মহাসচিব কে হবেন, সেই সিদ্ধান্ত দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হাতেই থাকবে। তিনি নেতাদের সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক আনুগত্য, তৃণমূলের সঙ্গে যোগাযোগ, সরকার ও দলের মধ্যে সমন্বয়ের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক পরিকল্পনা বিবেচনায় নিতে পারেন। কাউন্সিলের মাধ্যমে দলের মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রেও দলের চেয়ারম্যানের মতামতকেই গুরুত্ব দেওয়ার প্রচলন দেখা গেছে অতীতে।
এ মুহূর্তে মহাসচিব হিসেবে সালাহউদ্দিন আহমদ. ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন ও রুহুল কবির রিজভীর নাম সবচেয়ে জোরালোভাবে আলোচিত হলেও শেষ মুহূর্তে অন্য কাউকেও বেছে নেওয়া হতে পারে। আবার কাউন্সিলের আগে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব হিসেবে রিজভী দায়িত্ব পালন করলে সেই সময়ের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক বাস্তবতায় পরবর্তী সিদ্ধান্তে প্রভাব ফেলতে পারে।




















