মেসি ইয়ামালের গল্পটি রূপকথাকেও হার মানায়!
- আপডেট সময় : ১১:৩৩:৪৫ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৯ জুলাই ২০২৬ ১৮ বার পড়া হয়েছে

ফুটবল মাঠে রূপকথা অনেক তৈরি হয়, তবে লিওনেল মেসি এবং লামিন ইয়ামালের গল্পটি রূপকথাকেও হার মানায়। এটি যেন বিখ্যাত মার্কিন চলচিত্র পরিচালক ক্রিস্টোফার নোলানের কোনো সিনেমা, যেখানে সময় নিজেই নিজের চারপাশে মোচড় দিয়ে এক অদ্ভুত বৃত্ত পূরণ করেছে।
২০০৭ সালের ডিসেম্বর মাসের এক শীতের দিন। বার্সেলোনার ড্রেসিংরুমে ইউনিসেফের একটি চ্যারিটি ফটোশুটের জন্য ২০ বছরের মেসি পাঁচ মাসের এক শিশুকে প্লাস্টিকের টবে গোসল করিয়েছিলেন। আজ ২০২৬ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে, সেই শিশুটিই ৩৯ বছর বয়সী সর্বকালের সেরা ফুটবলারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তার শেষ বিশ্বকাপ জয়ের পথে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ সময় আজ রাত ১টায় বিশ্বকাপ ফাইনালে মাঠে নামবে স্পেন ও আর্জেন্টিনা। এক দিকে টানা দুই বিশ্বকাপ ও সবমিলিয়ে চতুর্থ শিরোপা জয়ের হাঁতছানি আলবিসেলেস্তেদের, অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা উঁচিয়ে ধরার সামনে স্পেন। এই দুই দেশের ফাইনালের মহারণের আগে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় মেসি বনাম ইয়ামালের লড়াই।
মেসির বয়স ৩৯ হলেও ধরে রেখেছেন অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা। চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে ৮ গোল ও চার অ্যাসিস্ট করেছেন মেসি। টুর্নামেন্টে গোল্ডেন বুট জেতার দৌড়ে দ্বিতীয় স্থানে আর্জেন্টাইন অধিনায়ক। ১০ গোল ও চার অ্যাসিস্ট নিয়ে প্রথম স্থানে ফ্রান্সের অধিনায়ক কিলিয়ান এমবাপে।
পজিশনিং, নিখুঁত ভিশন এবং জাদুকরী পাস দিয়ে আর্জেন্টিনাকে টানা দ্বিতীয়বারের মতো ফাইনালে তুলেছেন মেসি। সেমিফাইনালে মেসির দুটি অ্যাসিস্ট থেকে ফাইনালে উঠেছে আর্জেন্টিনা।
২০২২ ফিফা বিশ্বকাপ জয়ের পর মেসির ক্যারিয়ারে পাওয়ার মত বড় কোন কিছু নেই আর। ৩৯ বছর বয়সেও যেভাবে পুরো বিশ্বকাপে দাঁপিয়ে বেড়িয়েছেন তা এক কথায় অসাধারণ। চলতি টুর্নামেন্টের গ্রুপপর্বে আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপ ক্যারিয়ারের প্রথম হ্যাটট্রিকের দেখা পান মেসি।
২০২৬ বিশ্বকাপই বলা যায় মেসির শেষ বিশ্বকাপ। একজন ফুটবলার ক্যারিয়ারে যা কিছু অর্জন করতে পারেন তার সবকিছুই নিজের করে নিয়েছেন মেসি। নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে বিদায়বেলাটা তাই রাঙ্গাতে চাইবেন তিনি এটাই স্বাভাবিক।
আর সেই পথে মেসির সবচেয়ে বড় বাধা ইয়ামাল। গত সোমবারই (১৩জুলাই) ১৯ বছরে পা দেওয়া এই তরুণ তুর্কি ডানা মেলা শুরু করেছেন সহজাত বিস্ময়কর প্রতিভা নিয়ে। ২০২৬ বিশ্বকাপে নামের পাশে সাত ম্যাচে ১ গোল। গ্রুপপর্বে সৌদি আরবের বিপক্ষে গোল করে মেসির একটি রেকর্ড ভেঙ্গে দেন ইয়ামাল।
২০০৬ বিশ্বকাপে সার্বিয়া ও মন্টেনেগ্রোর বিপক্ষে যখন মেসি তার প্রথম বিশ্বকাপ গোলটি করেছিলেন, তখন তাঁর বয়স ছিল ১৮ বছর ৩৫৭ দিন। ১৪ দিনের ব্যবধানে মেসিকে টপকে বিশ্বকাপের ইতিহাসের কনিষ্ঠতম তালিকার সর্বকনিষ্ঠ গোলদাতার তালিকার ৮ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছেন ইয়ামাল।
চলতি বিশ্বকাপে এটিই ইয়ামালের একমাত্র গোল ছিল। তবে শুধু সংখ্যা দিয়ে ইয়ামালের প্রভাব বোঝানো যাবে না। এই তারকার দলে উপস্থিতি মানেই প্রতিপক্ষের জন্য আলাদা চিন্তা। নিজের সেরা দিনে যে কোন দেশের রক্ষণভাগকে তছনছ করে দিতে পারেন ইয়ামাল।
মেসির সঙ্গে ইয়ামালের পরিসংখ্যান দেখলেই বিষয়টি স্পষ্ট হয় আরও। মেসি যখন ১৯ বছরে পা দিয়েছিলেন, তখন তার ক্যারিয়ারে গোল ছিল ১৯টি, সঙ্গে একটি লা লিগা ও একটি চ্যাম্পিয়নস লিগ শিরোপা। অন্যদিকে, ইতিমধ্যেই ৫৬টি গোল করার পাশাপাশি তিনটি লা লিগা, একটি কোপা দেল রে এবং স্পেনের হয়ে ইউরো ২০২৪ শিরোপা জিতে নিয়েছেন ইয়ামাল।
ইয়ামালের খোঁজখবর রাখেল মেসিও। ফাইনালের আগে নিউইয়র্কে আয়োজিত অনুষ্ঠানে স্পেনের তরুণ তারকাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন আর্জেন্টিনার অধিনায়ক। মেসি বলেন, ‘ইয়ামাল অসাধারণ একজন ফুটবলার। আমি তাকে অনেক দিন ধরেই অনুসরণ করছি, কারণ সে এমন একটি ক্লাবে (বার্সেলোনা) খেলে, যেটিকে আমি ভালোবাসি। মাত্র ১৯ বছর বয়সেই সে বিশ্ব ফুটবলের আইকনে পরিণত হয়েছে। সামনে তার পুরো ক্যারিয়ার পড়ে আছে এবং ইতিহাস গড়ার দারুণ সুযোগও রয়েছে। তবে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করব, যেন সেটা এবার না হয়।’
শৈশবে ইয়ামালকে কোলে নিয়ে তোলা সেই বিখ্যাত ছবি নিয়েও কথা বলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক, ‘আমি যখন ওর সঙ্গে ছবি তুলেছিলাম, তখন সে ছিল ছোট্ট একটি শিশু। আর এখন বিশ্বকাপের ফাইনালে তার বিপক্ষে খেলতে নামব—এটা সত্যিই অবিশ্বাস্য। জীবনে এমন ঘটনাও ঘটে! এখন সে বিশ্বের অন্যতম সেরা খেলোয়াড়।’
আন্তর্জাতিক ফুটবলে নিজের সম্ভাব্য শেষ মঞ্চে দাঁড়িয়ে কি মেসি পারবেন স্প্যানিশ এই দুর্গ ভাঙার কোনো জাদুকরী উপায় খুঁজে বের করতে? নাকি সেদিন মেসির হাতে গোসল করা সেই ছোট্ট ইয়ামাল আজ কেড়ে নেবে তার শেষ স্বপ্ন? বার্সেলোনার লা মেসিয়া একাডেমি থেক উঠে আসা এই দুই তারকার রোমাঞ্চকর দ্বৈরথ দেখার অপেক্ষায় ফুটবল বিশ্ব।






















