১২:২৬ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৯ জুলাই ২০২৬, ২৪ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

টানা চতুর্থ দিনের বৃষ্টিতে কার্যত অচল চট্টগ্রাম

পাহাড় ধসে ২ শিশুর মৃত্যু, চট্টগ্রামে ভূমিধসের শঙ্কা

চট্টগ্রাম প্রতিনিধি
  • আপডেট সময় : ০৫:০৮:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

টানা অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরে স্মরণকালের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

 

টানা চতুর্থ দিনের মতো ভারী বর্ষণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগর। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে পৃথক দুই স্থানে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সারাদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

৮ জুলাই(বুধবার) সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুর ছিন্নমূল এলাকায় পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে ওই এলাকার মঈনউদ্দিনের ছেলে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জানান, কয়েকদিন ধরেই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছিল। কিন্তু পরিবারটি স্থানান্তর না হওয়ায় বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের মাটি ধসে ঘরের ওপর পড়ে শিশুটির মৃত্যু হয়। নিহতের দাফনের জন্য পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।

একই দিন নগরীর পাঁচলাইশ থানার চশমা হিল এলাকার বাবু কলোনিতে পাহাড়ধসে সামিয়া (১২) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। পাঁচলাইশ থানার এসআই রিয়াজুল সালেহীন জানান, পাহাড়ের পাদদেশে থাকা ছয়টি ঘরের মধ্যে দুটি ঘরের ওপর মাটি ধসে পড়ে। এতে সামিয়া ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

এর আগে মঙ্গলবার রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার আদর্শ গ্রামে পাহাড়ধসে রেনু আক্তার (৫৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। একই দিন নগরীর রহমাননগর এলাকায় দেয়াল ধসে শফিকুল ইসলাম (৩২) নামে এক যুবক নিহত হন।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে নগরীর নিচু এলাকা এখনো জলমগ্ন রয়েছে। সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রাস্তায় যান চলাচল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হারে কমে যাওয়ায় নাগরিকদের নিত্য প্রয়োজনে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

অল্পসংখ্যক যান-বাহন চলাচল করলেও ৩/৪ গুন বৃদ্ধি ভাড়া হাঁকায় স্বল্প আয়ের জনগনের ভোগান্তি আরো চরমে। এদিকে নগরীর চকবাজার, বহদ্দার হাট, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, হালিশহর, পতেঙ্গা, ইপিজেড, হাটহাজারী সহ আরো বেশ কয়েকটি এলাকার নিচু এলাকার বাসা-বাড়ি ও দোকান পাটে পানি ঢুকে পড়েছে।

বাংলাদেশ বেতারের প্রকৌশল বিভাগে কর্মরত ও আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনীতে বসবাসরত আব্দুস ছাত্তার বলেন, তিনি বিগত ৮/১০ বছর ধরে এই কলনীতে আছে, বাসায় কখনো পানি ঢুকেনি, এবার সকল নালা-নর্দমা ছাপিয়ে বৃষ্ঠির পানি বাসায় ঢুকে পড়েছে।

বহদ্দার হাট এলাকায় বাসা সরকারী শিক্ষিকা সুলতানা সুলতানা বাজেকা বলেন, বাসা থেকে বের হয়ে সামনের সব অলি-গলি হাঁটু থেকে কোমর পানির নিচে, বাসা থেকে বের হয়ে কর্মস্থলে যাওয়াই দুরহ ব্যাপার।

বাকলিয়া রসুলবাগে বসবাসরত চট্ট সরঃ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র সাহিল বলেন, চারদিকে রাস্তাঘাঁট, অলি-গলি পানিতে ডুবে থাকায় স্কুলে কোচিংয়ে কোথাও যাওয়া যাচ্ছেনা।

আগ্রাবাদের হকার আবুল কাশেম বলেন, টানা বৃষ্ঠি ও রাস্তায় দোকানের নিচে পানি জমে থাকায় গত ৩/৪ দিন ধরে আয়-রোজগার একেবারেই বন্ধ হয়ে পড়েছে, এমতাবস্থায় সংসারের ভরনপোষন একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আবহাওয়া অফিসের পতেঙ্গা কেন্দ্র জানিয়েছে, বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৩৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বুধবারের ভারী বৃষ্টিপাতসংক্রান্ত সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৮ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ঢাকা বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এর ফলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে অস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে।

টানা অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরে স্মরণকালের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগে নগরজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

টানা চতুর্থ দিনের বৃষ্টিতে কার্যত অচল চট্টগ্রাম

পাহাড় ধসে ২ শিশুর মৃত্যু, চট্টগ্রামে ভূমিধসের শঙ্কা

আপডেট সময় : ০৫:০৮:৪০ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ জুলাই ২০২৬

টানা অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরে স্মরণকালের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে।

 

টানা চতুর্থ দিনের মতো ভারী বর্ষণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে চট্টগ্রাম মহানগর। নগরীর বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা এখনো কাটেনি। এরই মধ্যে পৃথক দুই স্থানে পাহাড়ধসে দুই শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর আগামী ৪৮ ঘণ্টায় সারাদেশে ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কার কথা জানিয়েছে।

৮ জুলাই(বুধবার) সকালে সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল ছলিমপুর ছিন্নমূল এলাকায় পাহাড়ধসে ১০ মাস বয়সী আশরাফুল ইসলাম নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়। সে ওই এলাকার মঈনউদ্দিনের ছেলে।

সীতাকুণ্ড উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফখরুল ইসলাম জানান, কয়েকদিন ধরেই পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে মাইকিং করা হচ্ছিল। কিন্তু পরিবারটি স্থানান্তর না হওয়ায় বৃষ্টির মধ্যে পাহাড়ের মাটি ধসে ঘরের ওপর পড়ে শিশুটির মৃত্যু হয়। নিহতের দাফনের জন্য পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ও শুকনো খাবার দেওয়া হয়েছে।

একই দিন নগরীর পাঁচলাইশ থানার চশমা হিল এলাকার বাবু কলোনিতে পাহাড়ধসে সামিয়া (১২) নামে এক কিশোরীর মৃত্যু হয়। পাঁচলাইশ থানার এসআই রিয়াজুল সালেহীন জানান, পাহাড়ের পাদদেশে থাকা ছয়টি ঘরের মধ্যে দুটি ঘরের ওপর মাটি ধসে পড়ে। এতে সামিয়া ঘটনাস্থলেই মারা যায়।

এর আগে মঙ্গলবার রাঙ্গুনিয়া পৌরসভার আদর্শ গ্রামে পাহাড়ধসে রেনু আক্তার (৫৫) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়। একই দিন নগরীর রহমাননগর এলাকায় দেয়াল ধসে শফিকুল ইসলাম (৩২) নামে এক যুবক নিহত হন।

এদিকে টানা বৃষ্টিতে নগরীর নিচু এলাকা এখনো জলমগ্ন রয়েছে। সড়কে যান চলাচল ব্যাহত হওয়ায় নগরবাসীকে চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। রাস্তায় যান চলাচল উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হারে কমে যাওয়ায় নাগরিকদের নিত্য প্রয়োজনে যাতায়াতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

অল্পসংখ্যক যান-বাহন চলাচল করলেও ৩/৪ গুন বৃদ্ধি ভাড়া হাঁকায় স্বল্প আয়ের জনগনের ভোগান্তি আরো চরমে। এদিকে নগরীর চকবাজার, বহদ্দার হাট, মুরাদপুর, আগ্রাবাদ, হালিশহর, পতেঙ্গা, ইপিজেড, হাটহাজারী সহ আরো বেশ কয়েকটি এলাকার নিচু এলাকার বাসা-বাড়ি ও দোকান পাটে পানি ঢুকে পড়েছে।

বাংলাদেশ বেতারের প্রকৌশল বিভাগে কর্মরত ও আগ্রাবাদ সিজিএস কলোনীতে বসবাসরত আব্দুস ছাত্তার বলেন, তিনি বিগত ৮/১০ বছর ধরে এই কলনীতে আছে, বাসায় কখনো পানি ঢুকেনি, এবার সকল নালা-নর্দমা ছাপিয়ে বৃষ্ঠির পানি বাসায় ঢুকে পড়েছে।

বহদ্দার হাট এলাকায় বাসা সরকারী শিক্ষিকা সুলতানা সুলতানা বাজেকা বলেন, বাসা থেকে বের হয়ে সামনের সব অলি-গলি হাঁটু থেকে কোমর পানির নিচে, বাসা থেকে বের হয়ে কর্মস্থলে যাওয়াই দুরহ ব্যাপার।

বাকলিয়া রসুলবাগে বসবাসরত চট্ট সরঃ কলেজিয়েট স্কুলের ছাত্র সাহিল বলেন, চারদিকে রাস্তাঘাঁট, অলি-গলি পানিতে ডুবে থাকায় স্কুলে কোচিংয়ে কোথাও যাওয়া যাচ্ছেনা।

আগ্রাবাদের হকার আবুল কাশেম বলেন, টানা বৃষ্ঠি ও রাস্তায় দোকানের নিচে পানি জমে থাকায় গত ৩/৪ দিন ধরে আয়-রোজগার একেবারেই বন্ধ হয়ে পড়েছে, এমতাবস্থায় সংসারের ভরনপোষন একেবারেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

আবহাওয়া অফিসের পতেঙ্গা কেন্দ্র জানিয়েছে, বুধবার দুপুর ১২টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ২৩৪ দশমিক ৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় ৪১২ দশমিক ৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়, যা গত ৪২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের বুধবারের ভারী বৃষ্টিপাতসংক্রান্ত সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে ৮ জুলাই বিকেল ৩টা থেকে পরবর্তী ৪৮ ঘণ্টায় খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম, রংপুর, রাজশাহী, ময়মনসিংহ, সিলেট ও ঢাকা বিভাগের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ হতে পারে। এর ফলে চট্টগ্রাম মহানগরীতে অস্থায়ী জলাবদ্ধতা এবং চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকায় ভূমিধসের ঝুঁকি রয়েছে।

টানা অতিভারী বর্ষণ, পাহাড়ি ঢল ও কর্ণফুলী নদীর জোয়ারের প্রভাবে চট্টগ্রাম মহানগরে স্মরণকালের ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার থেকে শুরু হওয়া এই দুর্যোগে নগরজীবন প্রায় স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যাওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।