বড় সাহেবের ড্রাইভার পরিচয়েই কি প্রভাবের রাজত্ব? ভালুকা ফায়ার স্টেশনের রাসেলকে ঘিরে নিয়োগ-বদলি ও ভয়ভীতির বিস্ফোরক অভিযোগ!
- আপডেট সময় : ১০:৩৪:৫৮ পূর্বাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬ ৫০ বার পড়া হয়েছে

নিজস্ব প্রতিবেদক।। আমি বড় সাহেবের ড্রাইভার,এই পরিচয়কে ঢাল বানিয়ে কি ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর বছরের পর বছর প্রভাব বিস্তার করেছেন ভালুকা ফায়ার স্টেশনের ড্রাইভার রাসেল? নিয়োগের নামে অর্থ আদায়, বদলি-পদায়নে তদবির, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং প্রভাবশালী মহলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিগত সুবিধা নেওয়ার মতো একের পর এক গুরুতর অভিযোগে এখন প্রশ্নের মুখে তার কথিত প্রভাববলয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে, কিন্তু রাসেলের প্রভাবের ঠিকানা বদলালেও কৌশল বদলায়নি। কখনো সাবেক প্রভাবশালী কর্মকর্তার গাড়িচালক পরিচয়, কখনো প্রশাসনিক মহলের ঘনিষ্ঠতার দাবি, আবার কখনো রাজনৈতিক পরিচয়ের আশ্রয়,এভাবেই নিজের চারপাশে একটি কথিত প্রভাববলয় গড়ে তোলার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
বড় সাহেবের ড্রাইভার পরিচয় নাকি প্রভাবের পাসওয়ার্ড?
অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে সাবেক সুরক্ষা সচিব আব্দুল্লাহ আল মাসুদ চৌধুরীর গাড়িচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করার পরিচয়কে সামনে রেখে ফায়ার সার্ভিসের বিভিন্ন পর্যায়েরকর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতেন রাসেল।অভিযোগকারীদের দাবি, প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কথা বলে অনেকের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হতো। বদলি, পদায়ন কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে ‘উপরের মহলে যোগাযোগ’ রয়েছে,এমন বার্তা দিয়ে নিজের অবস্থান শক্ত করার অভিযোগও রয়েছে।
প্রশ্ন উঠেছে,একজন গাড়িচালকের ব্যক্তিগত পরিচয় কীভাবে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার হয়ে উঠল?
চাকরি দেওয়ার নামে লাখ লাখ টাকা?
রাসেলকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ,সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাসে চাকরিপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার।অভিযোগকারীদের দাবি, ফায়ার সার্ভিসসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি দেওয়ার কথা বলে প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগের দাবি করা হতো। চাকরি নিশ্চিত করার আশ্বাস দিয়ে অর্থ চাওয়ার অভিযোগও রয়েছে। কথিত মধ্যস্থতাকারী বা দালালদের মাধ্যমে চাকরিপ্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও সামনে এসেছে।প্রশ্ন হলো,সরকারি চাকরি কি এখন তদবির আর টাকার বিনিময়ে ‘ম্যানেজ’ করার পণ্য?
বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগে পুরোনো নামও সামনে ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফায়ার সার্ভিসের বদলি ও পদায়নকে ঘিরে রাসেল ও সাময়িক বরখাস্ত এক কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে কথিত একটি প্রভাববলয়ের অভিযোগও সামনে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, কাঙ্ক্ষিত জায়গায় বদলি কিংবা পদায়নের সুযোগ করে দেওয়ার কথা বলে বিভিন্ন ব্যক্তির সঙ্গে অর্থের লেনদেনের চেষ্টা করা হতো। সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ এই কর্মকাণ্ডকে সরাসরি ‘বদলি-বাণিজ্য’ হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।যদি একটি সরকারি প্রতিষ্ঠানের বদলি-পদায়নও অর্থ ও তদবিরের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তাহলে প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জবাবদিহিতা কোথায়,এমন প্রশ্নই এখন ঘুরছে।
খুলনায় বদলি, আট মাস পর ঢাকায় প্রত্যাবর্তন,পেছনে কার হাত?
৫ আগস্টের পর রাসেলকে ঢাকার বাইরে খুলনায় বদলি করা হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের দাবি। সেখানে প্রায় আট মাস অবস্থানের পর বিভিন্ন পর্যায়ে তদবিরের মাধ্যমে আবার ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে ফিরে আসার অভিযোগও উঠেছে।অভিযোগ রয়েছে, সদর দপ্তরে অবস্থানকালেও নিয়োগ ও বদলি সংক্রান্ত প্রভাব বিস্তারের নানা তৎপরতা নিয়ে আলোচনা ছিল।এরপর আবার তাকে ভালুকা ফায়ার স্টেশন, ময়মনসিংহে বদলি করা হয় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
তাহলে প্রশ্ন থেকেই যায়,বারবার বদলি, আবার সদর দপ্তরে প্রত্যাবর্তন এবং পুনরায় মাঠপর্যায়ে পদায়নের পেছনে কি কেবল প্রশাসনিক সিদ্ধান্তই কাজ করেছে, নাকি ছিল অদৃশ্য তদবিরের হাত?
রাসেলকে ঘিরে ব্যক্তিগত সম্পর্ক সংক্রান্ত একটি লিখিত অভিযোগের কথাও সামনে এসেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর এক নারী অভিযোগ দিয়েছেন এবং সেখানে বিয়ের আশ্বাস দিয়ে সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগ তোলা হয়েছে।এই অভিযোগকে ঘিরেও নানা আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তেই এ অভিযোগের প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি,শুধু পরিচয় বদলেছে, প্রভাবের কৌশল কি একই?
অভিযোগকারীদের আরও দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ঘনিষ্ঠতার পরিচয় ব্যবহার করার পর বর্তমানে বিএনপির নাম ব্যবহার করে নতুন করে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছেন রাসেল।বর্তমান রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নিজের যোগাযোগ রয়েছে,এমন পরিচয় ব্যবহার করে বিভিন্ন জায়গায় সুপারিশ আদায়ের চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন,ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে, রাজনৈতিক সাইনবোর্ড বদলেছে, কিন্তু ‘বড় সাহেবের লোক’ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারের খেলা কি থেমেছে?
এক ড্রাইভারকে ঘিরে এত প্রশ্ন কেন?
একজন সরকারি কর্মচারীর বিরুদ্ধে যদি একই সঙ্গে নিয়োগের নামে অর্থ আদায়, বদলি-বাণিজ্য, ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রভাব বিস্তার এবং ব্যক্তিগত অনৈতিকতার মতো গুরুতর অভিযোগ ওঠে, তাহলে বিষয়টি আর ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে না।এটি সরাসরি ফায়ার সার্ভিসের প্রশাসনিক শৃঙ্খলা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা এবং প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তির সঙ্গে সম্পর্কিত।
অভিযোগকারীদের দাবি, রাসেলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো নিয়ে বিভাগীয়ভাবে কঠোর অনুসন্ধান হওয়া দরকার। অভিযোগ সত্য হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং অভিযোগ মিথ্যা হলে দায়মুক্তির সিদ্ধান্ত,দুটির একটি স্পষ্ট অবস্থান প্রয়োজন।
অভিযোগের ফাইল কি আবারও চাপা পড়ে যাবে?
ফায়ার সার্ভিসের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন নিয়ে অর্থ লেনদেন কিংবা ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ উঠলে সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।রাসেলকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলোর পেছনে কারা, কীভাবে এবং কতটা প্রভাব বিস্তার করেছে,তা এখন বড় প্রশ্ন।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই,বড় সাহেবের ড্রাইভার’ পরিচয় কি শুধুই চাকরির পরিচয় ছিল, নাকি সেই পরিচয়ই হয়ে উঠেছিল প্রভাব বিস্তারের পাসওয়ার্ড?
এই প্রশ্নের উত্তর এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছেই।






















