০৫:১৬ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৭ জুলাই ২০২৬, ২২ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

সোনা চোরাচালানের সাথে ৫০ মাফিয়া!

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৩৩:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬ ১৯ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

চলতি বছরের ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা মূল্যের ১৫৩টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। পরদিন অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়। কিন্তু তিন মাস পার হলেও এখনো তদন্তে কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছেন, বিমানে ৪৩৯ যাত্রী এবং ২০ জনের মতো বিমানবালা, টেকনিশিয়ান ও কেবিন ক্রু ছিলেন।

এত লোকের মধ্যে সন্দেহভাজনদের খুঁজে জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে বিমানের সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও মেলেনি কোনো ক্লু। এ অবস্থায় অবৈধ এই বিপুল সোনার আসল হোতাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে দুবাই থেকে ঢাকায় আসা বিমানের একটি ফ্লাইটের কার্গোহোল থেকে ৪৫ কোটি টাকা মূল্যের ১৬০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায়ও যথারীতি বিমানবন্দর থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিমানের কার্গোহোল থেকে সোনাগুলো উদ্ধার হওয়ায় কোনো ফুটেজ দেখে বাহক শনাক্তের সম্ভাবনা নেই। আর বাহক না পেলে চোরাচালানের গডফাদার শনাক্ত করাও কঠিন। শুধু এ দুই ঘটনাই নয়, বিমানবন্দর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার বেশির ভাগ সোনা জব্দ ঘটনার পরবর্তীতে কোনো কূলকিনারা হয় না।
যেসব সোনার চালানের সঙ্গে বাহক গ্রেপ্তার হয়, সে ক্ষেত্রে কিছু কিছু নাম বেরিয়ে এলেও তদন্ত সেখানেই শেষ। অভিযোগপত্রে ওই নামগুলো উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তারা আইনের আওতায় আসে না।
জানা গেছে, সোনা পাচারের বিগ ফিশেরা বিদেশে স্থায়ীভাবে সপরিবার বসতি গেড়েছেন। দেশে না আসায় তাদের আইনের আওতায় আনা যায় না। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিমানবন্দরের অশুভ চক্রের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার সোনা পাচার করছেন।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছেন, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা এ চক্রে অর্ধশত মাফিয়া রয়েছেন। আর মাঝারি চোরাকারবারি রয়েছেন ২ শতাধিক। যারা বিভিন্ন পন্থায় দেশে সোনা পাচার করছেন।
বিমানবন্দর থানা সূত্র জানিয়েছেন, ২০১৬ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে সোনা চোরাকালানসংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ২৭টি। মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৪৭টির। অন্য ৫০টির মধ্যে ৪২টি থানা পুলিশ ও ৮টি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে। তবে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার সোনার চালানের অভিযোগপত্র দেওয়া বেশির ভাগ মামলাতেই মাফিয়াদের খোঁজ মেলেনি বলে জানা গেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, বর্তমানে সক্রিয় মাফিয়াদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী নরসিংদীর আনোয়ার, শরীয়তপুরের হান্নান শিকদার ও মুন্সিগঞ্জের জুমন, সৌদিতে অবস্থান করা কুমিল্লার সাইফুল অন্যতম। এ ছাড়া দুবাইয়ে অবস্থান করা শওকত, মোস্তফা, নোমান ও নজরুলের নাম রয়েছে পুলিশের তালিকায়। বিদেশে অবস্থানকারী এ রকম অর্ধশত মাফিয়া নিজ নিজ এলাকায় আলাদা চক্র গড়ে তুলে বিভিন্ন জুয়েলারির দোকানে বিক্রি করছেন। আবার অনেকে প্রতিবেশী দেশে পাচারও করছেন। কাস্টমস সূত্র জানিয়েছেন, গত সাড়ে পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা মূল্যের ৯০২ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। নিয়মিত সোনা জব্দ হলেও রহস্যজনক কারণে চালান থামছে না বলে জানা গেছে।

মুয়াল্লিমদের দলে ভেড়াচ্ছে চক্র : গত বছরের ২২ নভেম্বর শাহজালাল বিমানবন্দরের ১ নম্বর ক্যানোপি-সংলগ্ন এপিবিএন অফিসের পাশ থেকে নূরুল আলম নামে সৌদিফেরত এক যাত্রী ১ কেজি ৩০০ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ গ্রেপ্তার হন। তিনি ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন। তাঁর গলায় ঝোলানো হজে ব্যবহৃত কাপড়ের ব্যাগের ভিতর, পরনে থাকা জুব্বা ও পাজামার ভিতর গয়নাগুলো লুকানো ছিল। এ মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, সৌদি থেকে ফেরত আসা হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের সোনা পরিবহনের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়ে প্রলোভনে ফেলা হয়। এ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন মুয়াল্লিমদের বড় অংশ। ধর্মীয় অনুভূতি ও পোশাক কাজে লাগিয়ে এসব যাত্রী অবৈধ সোনা নিয়ে দেশে প্রবেশ করছেন। মুয়াল্লিমের নেতৃত্বে একসঙ্গে অনেক যাত্রী থাকায় বিমানবন্দরে তেমন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় না বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মুয়াল্লিমের নাম উঠে এসেছে পুলিশি তদন্তে। তাদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য
ট্যাগস :

সোনা চোরাচালানের সাথে ৫০ মাফিয়া!

আপডেট সময় : ০১:৩৩:১১ পূর্বাহ্ন, মঙ্গলবার, ৭ জুলাই ২০২৬

চলতি বছরের ২৮ মার্চ রাতে দুবাই থেকে ঢাকায় আসা বিমান বাংলাদেশের একটি ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেট থেকে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা মূল্যের ১৫৩টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়। পরদিন অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে বিমানবন্দর থানায় মামলা হয়। কিন্তু তিন মাস পার হলেও এখনো তদন্তে কোনো কূলকিনারা করতে পারেনি পুলিশ। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র বলছেন, বিমানে ৪৩৯ যাত্রী এবং ২০ জনের মতো বিমানবালা, টেকনিশিয়ান ও কেবিন ক্রু ছিলেন।

এত লোকের মধ্যে সন্দেহভাজনদের খুঁজে জিজ্ঞাসাবাদ করা তদন্তকারীদের জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইতোমধ্যে বিমানের সাত কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও মেলেনি কোনো ক্লু। এ অবস্থায় অবৈধ এই বিপুল সোনার আসল হোতাকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়। অন্যদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে দুবাই থেকে ঢাকায় আসা বিমানের একটি ফ্লাইটের কার্গোহোল থেকে ৪৫ কোটি টাকা মূল্যের ১৬০টি সোনার বার উদ্ধার করা হয়।
এ ঘটনায়ও যথারীতি বিমানবন্দর থানায় অজ্ঞাতনামাদের আসামি করে মামলা হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বিমানের কার্গোহোল থেকে সোনাগুলো উদ্ধার হওয়ায় কোনো ফুটেজ দেখে বাহক শনাক্তের সম্ভাবনা নেই। আর বাহক না পেলে চোরাচালানের গডফাদার শনাক্ত করাও কঠিন। শুধু এ দুই ঘটনাই নয়, বিমানবন্দর থেকে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার বেশির ভাগ সোনা জব্দ ঘটনার পরবর্তীতে কোনো কূলকিনারা হয় না।
যেসব সোনার চালানের সঙ্গে বাহক গ্রেপ্তার হয়, সে ক্ষেত্রে কিছু কিছু নাম বেরিয়ে এলেও তদন্ত সেখানেই শেষ। অভিযোগপত্রে ওই নামগুলো উল্লেখ করা হলেও বাস্তবে তারা আইনের আওতায় আসে না।
জানা গেছে, সোনা পাচারের বিগ ফিশেরা বিদেশে স্থায়ীভাবে সপরিবার বসতি গেড়েছেন। দেশে না আসায় তাদের আইনের আওতায় আনা যায় না। আর এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে বিমানবন্দরের অশুভ চক্রের মাধ্যমে শত শত কোটি টাকার সোনা পাচার করছেন।

পুলিশ সূত্র জানিয়েছেন, দুবাই, মালয়েশিয়া ও সৌদি আরবকেন্দ্রিক গড়ে ওঠা এ চক্রে অর্ধশত মাফিয়া রয়েছেন। আর মাঝারি চোরাকারবারি রয়েছেন ২ শতাধিক। যারা বিভিন্ন পন্থায় দেশে সোনা পাচার করছেন।
বিমানবন্দর থানা সূত্র জানিয়েছেন, ২০১৬ থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত সাড়ে ১০ বছরে সোনা চোরাকালানসংক্রান্ত ৬৯৭টি মামলা হয়েছে। এর মধ্যে গত ছয় মাসে মামলা হয়েছে ২৭টি। মামলার নিষ্পত্তি হয়েছে ৬৪৭টির। অন্য ৫০টির মধ্যে ৪২টি থানা পুলিশ ও ৮টি পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তদন্ত করছে। তবে পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার সোনার চালানের অভিযোগপত্র দেওয়া বেশির ভাগ মামলাতেই মাফিয়াদের খোঁজ মেলেনি বলে জানা গেছে। একাধিক সূত্র জানিয়েছেন, বর্তমানে সক্রিয় মাফিয়াদের মধ্যে মালয়েশিয়ায় অবস্থানকারী নরসিংদীর আনোয়ার, শরীয়তপুরের হান্নান শিকদার ও মুন্সিগঞ্জের জুমন, সৌদিতে অবস্থান করা কুমিল্লার সাইফুল অন্যতম। এ ছাড়া দুবাইয়ে অবস্থান করা শওকত, মোস্তফা, নোমান ও নজরুলের নাম রয়েছে পুলিশের তালিকায়। বিদেশে অবস্থানকারী এ রকম অর্ধশত মাফিয়া নিজ নিজ এলাকায় আলাদা চক্র গড়ে তুলে বিভিন্ন জুয়েলারির দোকানে বিক্রি করছেন। আবার অনেকে প্রতিবেশী দেশে পাচারও করছেন। কাস্টমস সূত্র জানিয়েছেন, গত সাড়ে পাঁচ বছরে ৩ হাজার ৭২৮ কোটি টাকা মূল্যের ৯০২ কেজি সোনা জব্দ করা হয়েছে। নিয়মিত সোনা জব্দ হলেও রহস্যজনক কারণে চালান থামছে না বলে জানা গেছে।

মুয়াল্লিমদের দলে ভেড়াচ্ছে চক্র : গত বছরের ২২ নভেম্বর শাহজালাল বিমানবন্দরের ১ নম্বর ক্যানোপি-সংলগ্ন এপিবিএন অফিসের পাশ থেকে নূরুল আলম নামে সৌদিফেরত এক যাত্রী ১ কেজি ৩০০ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ গ্রেপ্তার হন। তিনি ওমরাহ করতে গিয়েছিলেন। তাঁর গলায় ঝোলানো হজে ব্যবহৃত কাপড়ের ব্যাগের ভিতর, পরনে থাকা জুব্বা ও পাজামার ভিতর গয়নাগুলো লুকানো ছিল। এ মামলার তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, সৌদি থেকে ফেরত আসা হজ ও ওমরাহ যাত্রীদের সোনা পরিবহনের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব দিয়ে প্রলোভনে ফেলা হয়। এ কাজে জড়িয়ে পড়ছেন মুয়াল্লিমদের বড় অংশ। ধর্মীয় অনুভূতি ও পোশাক কাজে লাগিয়ে এসব যাত্রী অবৈধ সোনা নিয়ে দেশে প্রবেশ করছেন। মুয়াল্লিমের নেতৃত্বে একসঙ্গে অনেক যাত্রী থাকায় বিমানবন্দরে তেমন অসুবিধার সম্মুখীন হতে হয় না বলে জানা গেছে। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন মুয়াল্লিমের নাম উঠে এসেছে পুলিশি তদন্তে। তাদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনা হবে।