১২:৫৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ০৮ অগাস্ট ২০২৬, ২৪ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
নারী ও শিশুর নিরাপত্তায় ভয়াবহ সংকট! নীরবতা ভাঙার এখনই সময়! বাকেরগঞ্জে ইউএনওর স্বেচ্ছাচারিতায় নাগরিক সেবাথেকে বঞ্চিত হচ্ছে জনগণ। হাফিজুর রহমানের গুজব নিউজ সিন্ডিকেট-পেছনের দরজা দিয়ে তৎপরতা অপরাধ বিচিত্রার মোরশেদসহ দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে পাহাড়সম অভিযোগ! লাকুটিয়া খাল খনন ছাড়াই ফেরত গেল কোটি কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ! দেশবরেণ্য অনুসন্ধানী সাংবাদিক সাঈদুর রহমান রিমনের ১ম মৃত্যুবার্ষিকীতে দোয়া ও মিলাদ মাহফিল এক স্বাচিপ নেতাকে হটিয়ে আরেক স্বাচিপ নেতাকে আনলো ড্যাব! সাংবাদিকতা পেশায় রাতারাতি বিত্তশালী হওয়ার সম্ভাবনা নেই -তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রী বরিশালে শাপলা বিলে পানিতে ডুবে পর্যটকের ম’র্মা’ন্তিক মৃ’ত্যু লাইসেন্স ফিরে পেল আদ্-দ্বীন হাসপাতাল

নারী ও শিশুর নিরাপত্তায় ভয়াবহ সংকট! নীরবতা ভাঙার এখনই সময়!

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ১২:১৮:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬ ২১ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে, প্রযুক্তিতে ছড়াচ্ছে সহিংসতার দৃশ্য বিচারহীনতা ও সামাজিক নীরবতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

 

নিকোলাস বিশ্বাস।।নারী ও শিশু নির্যাতন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধের ঘটনা নয়,এটি সমাজের মানবিকতা, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের সামনে বড় ধরনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ, বাল্যবিবাহ ও হত্যার মতো ঘটনা একের পর এক সামনে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের সামনে যেমন বাস্তবতা উন্মোচিত হচ্ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধের পাশাপাশি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে,অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও পরিবার বিচার চাইতে গিয়ে সামাজিক চাপ, প্রতিশোধের ভয়, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে পড়ে। ফলে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না, আর অপরাধীরা পেয়ে যায় আরও একটি সুযোগ।

 

বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, বাংলাদেশেও পরিস্থিতি নাজুক..

 

বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। চলমান সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট, মানবিক সহায়তার ঘাটতি এবং লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতির পরও বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে শারীরিক কিংবা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে হয়রানি, ভুয়া কনটেন্ট তৈরি, হুমকি ও চরিত্রহননের মাধ্যমে বিশেষ করে নারী সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক আন্দোলনকারীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা বাড়ছে।

বাংলাদেশে পরিসংখ্যানও দিচ্ছে সতর্কবার্তা…

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংগৃহীত তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।বাংলাদেশ পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর নয় মাসের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ বলে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,০৪২। অর্থাৎ প্রতিবেদনের হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্যেও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫ জন শিশু শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা যৌন নির্যাতনের পর প্রাণ হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

 

শিশুর জন্য ‘শৃঙ্খলা’, বাস্তবে নির্যাতন..

 

শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সংগৃহীত বিভিন্ন উপাত্ত অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশু শৃঙ্খলার নামে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের উচ্চ হারও কিশোরীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।অন্যদিকে পারিবারিক সহিংসতার একটি বড় অংশ এখনও অপ্রকাশিত থেকে যায়। সামাজিক সম্মান, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, পরিবার ভেঙে যাওয়ার ভয় এবং ‘সংসার টিকিয়ে রাখার’ সামাজিক চাপের কারণে অনেক নারী নির্যাতন সহ্য করেও মুখ খোলেন না।এই নীরবতাই অনেক সময় অপরাধীর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।

 

আইন আছে, কিন্তু প্রশ্ন বাস্তবায়নে..

নারী ও শিশু সুরক্ষায় দেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, জাতীয় হেল্পলাইনসহ বিভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না,প্রয়োজন তার নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগ।বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য ও পর্যবেক্ষণে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠে এসেছে। ফলে একটি মামলা দায়ের হওয়ার পরও চূড়ান্ত বিচার পর্যন্ত পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।বিচার যদি বিলম্বিত হয়, তাহলে অপরাধীর কাছে আইন তার ভয় হারায় আর ভুক্তভোগীর কাছে ন্যায়বিচার হয়ে ওঠে অনিশ্চিত প্রত্যাশা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: প্রতিবাদের শক্তি, আবার দ্বিতীয় দফা নির্যাতনের ঝুঁকিও প্রযুক্তি একদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কোনো ঘটনার ছবি বা ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অপরাধী শনাক্ত করা, জনমত তৈরি করা এবং প্রশাসনের ওপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে।

 

কিন্তু একই প্রযুক্তি ভুক্তভোগীর জন্য নতুন বিপদও তৈরি করছে।

 

নির্যাতনের ভিডিও বারবার প্রচার, ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ, সংবেদনশীল ছবি ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা যাচাই না করে গুজব প্রকাশ,এসবের মাধ্যমে একজন ভুক্তভোগী দ্বিতীয়বার সামাজিক নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।

 

সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে তাই দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে যেন ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা ধ্বংস না হয়,সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

রাজনৈতিক সংঘাতেও বলি নারী-শিশু..

রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের নামে হামলা, গণপিটুনি, প্রকাশ্যে অপমান কিংবা নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।ক্ষমতার প্রদর্শন যখন সহিংসতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে দুর্বল জনগোষ্ঠী। নারী ও শিশুরা সেই ঝুঁকির অন্যতম অংশ।কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব যেন অপরাধীর জন্য ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়,এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সমাজের ন্যূনতম অঙ্গীকার।

 

এখন কী করতে হবে?

 

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে শুধু সভা-সেমিনার কিংবা আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ।প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।দ্বিতীয়ত, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।তৃতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সহমর্মিতা, সম্মান, সমতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে হবে।চতুর্থত, ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। পোশাক, চলাফেরা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কোনো অপরাধের বৈধ কারণ হতে পারে না।পঞ্চমত, গণমাধ্যমকে ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

ষষ্ঠত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে,নারী ও শিশু নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তিই দলীয় পরিচয়ের আড়ালে সুরক্ষা পাবে না।সপ্তমত, শিশু সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী, পেশাদার ও সমাজভিত্তিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা ব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।

নীরবতা আর নয়..

একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে মাপা যায় না। প্রকৃত সভ্যতার পরীক্ষা হলো,রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত নাগরিককে কতটা নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দিতে পারে।আজ যে নারী নির্যাতনের শিকার, সে হয়তো আমাদের পাশের বাড়ির মানুষ। আজ যে শিশুটি নির্যাতিত, সে হয়তো আমাদেরই পরিবারের কোনো সন্তান।

তাই নারী ও শিশু নির্যাতনকে ‘অন্যের সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।অন্যায়ের সামনে নীরবতা অপরাধীকে শক্তিশালী করে। আর নীরবতা ভাঙা,ন্যায়বিচারের প্রথম পদক্ষেপ।
এখন প্রয়োজন শুধু প্রতিবাদ নয়,প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, অপরাধীর জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ।

 

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়,এটি তাদের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই নীরবতা ভাঙতে হবে।

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

নারী ও শিশুর নিরাপত্তায় ভয়াবহ সংকট! নীরবতা ভাঙার এখনই সময়!

আপডেট সময় : ১২:১৮:২৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ৮ অগাস্ট ২০২৬

নির্যাতনের ঘটনা বাড়ছে, প্রযুক্তিতে ছড়াচ্ছে সহিংসতার দৃশ্য বিচারহীনতা ও সামাজিক নীরবতা অপরাধীদের আরও বেপরোয়া করে তুলছে।

 

নিকোলাস বিশ্বাস।।নারী ও শিশু নির্যাতন এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো অপরাধের ঘটনা নয়,এটি সমাজের মানবিকতা, নৈতিকতা এবং রাষ্ট্রীয় দায়িত্ববোধের সামনে বড় ধরনের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। শারীরিক নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি, পারিবারিক সহিংসতা, অপহরণ, বাল্যবিবাহ ও হত্যার মতো ঘটনা একের পর এক সামনে আসছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এসব ঘটনার ছবি ও ভিডিও ছড়িয়ে পড়ায় মানুষের সামনে যেমন বাস্তবতা উন্মোচিত হচ্ছে, তেমনি তৈরি হচ্ছে ভয়, আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার পরিবেশ।

 

বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরাধের পাশাপাশি সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে,অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগী ও পরিবার বিচার চাইতে গিয়ে সামাজিক চাপ, প্রতিশোধের ভয়, অর্থনৈতিক সংকট এবং প্রভাবশালী মহলের চাপের মুখে পড়ে। ফলে অনেক ঘটনা প্রকাশ্যে আসে না, আর অপরাধীরা পেয়ে যায় আরও একটি সুযোগ।

 

বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ, বাংলাদেশেও পরিস্থিতি নাজুক..

 

বিশ্বব্যাপী নারী ও শিশু নির্যাতনের পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। চলমান সংঘাত, অর্থনৈতিক সংকট, মানবিক সহায়তার ঘাটতি এবং লিঙ্গসমতার অগ্রযাত্রার বিরুদ্ধে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
কয়েক দশকের আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও প্রতিশ্রুতির পরও বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক নারী জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে শারীরিক কিংবা যৌন সহিংসতার শিকার হচ্ছেন। একই সঙ্গে প্রযুক্তির অপব্যবহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করে হয়রানি, ভুয়া কনটেন্ট তৈরি, হুমকি ও চরিত্রহননের মাধ্যমে বিশেষ করে নারী সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী ও সামাজিক আন্দোলনকারীদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা বাড়ছে।

বাংলাদেশে পরিসংখ্যানও দিচ্ছে সতর্কবার্তা…

বাংলাদেশের সাম্প্রতিক বিভিন্ন প্রতিবেদন ও সংগৃহীত তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতার ইঙ্গিত দিচ্ছে।বাংলাদেশ পুলিশের নথি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে সারাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ২,০১১টি মামলা নিবন্ধিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি ২০২৫ সালের জুলাইয়ের পর নয় মাসের মধ্যে একক মাসে সর্বোচ্চ বলে দাবি করা হয়েছে।

অন্যদিকে হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটির (এইচআরএসএস) অর্ধবার্ষিক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ১,৬২১ জন নারী ও কিশোরী সহিংসতার শিকার হয়েছেন। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ১,০৪২। অর্থাৎ প্রতিবেদনের হিসাবে এক বছরের ব্যবধানে এ ধরনের ঘটনা প্রায় ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) সংগৃহীত তথ্যেও শিশু নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র উঠে এসেছে। ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৪৯০ জন শিশু নির্যাতনের শিকার হয়েছে বলে তথ্যটিতে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১৯৫ জন শিশু শারীরিক নির্যাতন, পারিবারিক সহিংসতা কিংবা যৌন নির্যাতনের পর প্রাণ হারিয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

 

শিশুর জন্য ‘শৃঙ্খলা’, বাস্তবে নির্যাতন..

 

শিশুদের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। সংগৃহীত বিভিন্ন উপাত্ত অনুযায়ী, ১ থেকে ১৪ বছর বয়সী বিপুলসংখ্যক শিশু শৃঙ্খলার নামে শারীরিক সহিংসতার শিকার হয়। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহের উচ্চ হারও কিশোরীদের নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।অন্যদিকে পারিবারিক সহিংসতার একটি বড় অংশ এখনও অপ্রকাশিত থেকে যায়। সামাজিক সম্মান, অর্থনৈতিক নির্ভরতা, পরিবার ভেঙে যাওয়ার ভয় এবং ‘সংসার টিকিয়ে রাখার’ সামাজিক চাপের কারণে অনেক নারী নির্যাতন সহ্য করেও মুখ খোলেন না।এই নীরবতাই অনেক সময় অপরাধীর সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে ওঠে।

 

আইন আছে, কিন্তু প্রশ্ন বাস্তবায়নে..

নারী ও শিশু সুরক্ষায় দেশে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, জাতীয় হেল্পলাইনসহ বিভিন্ন আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে। কিন্তু আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না,প্রয়োজন তার নিরপেক্ষ ও কার্যকর প্রয়োগ।বিভিন্ন সংগঠনের তথ্য ও পর্যবেক্ষণে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, তদন্তের দুর্বলতা, সাক্ষীর নিরাপত্তাহীনতা এবং প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপের অভিযোগ উঠে এসেছে। ফলে একটি মামলা দায়ের হওয়ার পরও চূড়ান্ত বিচার পর্যন্ত পৌঁছাতে দীর্ঘ সময় লেগে যায়।বিচার যদি বিলম্বিত হয়, তাহলে অপরাধীর কাছে আইন তার ভয় হারায় আর ভুক্তভোগীর কাছে ন্যায়বিচার হয়ে ওঠে অনিশ্চিত প্রত্যাশা।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম: প্রতিবাদের শক্তি, আবার দ্বিতীয় দফা নির্যাতনের ঝুঁকিও প্রযুক্তি একদিকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। কোনো ঘটনার ছবি বা ভিডিও দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে অপরাধী শনাক্ত করা, জনমত তৈরি করা এবং প্রশাসনের ওপর দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হচ্ছে।

 

কিন্তু একই প্রযুক্তি ভুক্তভোগীর জন্য নতুন বিপদও তৈরি করছে।

 

নির্যাতনের ভিডিও বারবার প্রচার, ভুক্তভোগীর পরিচয় প্রকাশ, সংবেদনশীল ছবি ছড়িয়ে দেওয়া কিংবা যাচাই না করে গুজব প্রকাশ,এসবের মাধ্যমে একজন ভুক্তভোগী দ্বিতীয়বার সামাজিক নির্যাতনের শিকার হতে পারেন।

 

সাংবাদিকতা ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে তাই দায়িত্বশীলতা অপরিহার্য। অপরাধের বিরুদ্ধে কথা বলতে গিয়ে যেন ভুক্তভোগীর মর্যাদা ও গোপনীয়তা ধ্বংস না হয়,সেদিকেও নজর রাখতে হবে।

রাজনৈতিক সংঘাতেও বলি নারী-শিশু..

রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু রাজনৈতিক বিরোধের নামে হামলা, গণপিটুনি, প্রকাশ্যে অপমান কিংবা নির্যাতন কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।ক্ষমতার প্রদর্শন যখন সহিংসতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা হয়, তখন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে দুর্বল জনগোষ্ঠী। নারী ও শিশুরা সেই ঝুঁকির অন্যতম অংশ।কোনো রাজনৈতিক পরিচয়, ক্ষমতা কিংবা প্রভাব যেন অপরাধীর জন্য ঢাল হয়ে না দাঁড়ায়,এটাই হওয়া উচিত রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক সমাজের ন্যূনতম অঙ্গীকার।

 

এখন কী করতে হবে?

 

নারী ও শিশু নির্যাতন বন্ধে শুধু সভা-সেমিনার কিংবা আইন প্রণয়ন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন দৃশ্যমান ও কার্যকর পদক্ষেপ।প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে।দ্বিতীয়ত, নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলায় দ্রুত তদন্ত, সাক্ষী সুরক্ষা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বিচার নিশ্চিত করতে হবে।তৃতীয়ত, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সহমর্মিতা, সম্মান, সমতা ও মানবিকতার শিক্ষা দিতে হবে।চতুর্থত, ভুক্তভোগীকে দোষারোপের সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে। পোশাক, চলাফেরা বা ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত কোনো অপরাধের বৈধ কারণ হতে পারে না।পঞ্চমত, গণমাধ্যমকে ভুক্তভোগীর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষায় সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে।

 

ষষ্ঠত, রাজনৈতিক দলগুলোকে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে,নারী ও শিশু নির্যাতনের সঙ্গে জড়িত কোনো ব্যক্তিই দলীয় পরিচয়ের আড়ালে সুরক্ষা পাবে না।সপ্তমত, শিশু সুরক্ষায় একটি শক্তিশালী, পেশাদার ও সমাজভিত্তিক সুরক্ষা কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। বিভিন্ন সরকারি সংস্থা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসা ব্যবস্থা ও নাগরিক সমাজের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জরুরি।

নীরবতা আর নয়..

একটি রাষ্ট্র কতটা উন্নত, তা শুধু তার অর্থনীতি, অবকাঠামো কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতে মাপা যায় না। প্রকৃত সভ্যতার পরীক্ষা হলো,রাষ্ট্র তার সবচেয়ে দুর্বল ও অরক্ষিত নাগরিককে কতটা নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার দিতে পারে।আজ যে নারী নির্যাতনের শিকার, সে হয়তো আমাদের পাশের বাড়ির মানুষ। আজ যে শিশুটি নির্যাতিত, সে হয়তো আমাদেরই পরিবারের কোনো সন্তান।

তাই নারী ও শিশু নির্যাতনকে ‘অন্যের সমস্যা’ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।অন্যায়ের সামনে নীরবতা অপরাধীকে শক্তিশালী করে। আর নীরবতা ভাঙা,ন্যায়বিচারের প্রথম পদক্ষেপ।
এখন প্রয়োজন শুধু প্রতিবাদ নয়,প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত, দ্রুত বিচার, অপরাধীর জবাবদিহি এবং ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দৃশ্যমান রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ।

 

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা কোনো দয়া নয়,এটি তাদের মৌলিক অধিকার। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে এখনই নীরবতা ভাঙতে হবে।