০৬:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ২১ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
গণমাধ্যমের পুরোনো সিংহাসনে আবার বসার চেষ্টা? ডিবিসি কাণ্ডে ইকবাল সোবহান, পর্দার আড়ালের সাংবাদিকতা ও ক্ষমতার পুরোনো খেলোয়াড়দের নিয়ে তোলপাড়! জাতীয় নিরাপদ সড়ক দিবস উপলক্ষে পেশাদার চালকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করল বিআরটিএ স্বল্পমূল্যে চিকিৎসাসেবায় মানুষের আস্থা অর্জন ডা. আমির হামজার, রেনু বেগমের মৃত্যু ঘিরে সামনে আসুক প্রকৃত ঘটনা দুর্নীতির খবর প্রকাশের জেরে ২০ লাখ টাকার চাঁদাবাজি মামলা! জামিন পেলেন দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের দুই সম্পাদক! বরিশাল তরুণ সাংবাদিক ঐক্য পরিষদের নতুন কমিটি গঠন! বেতাগীতে রাইসমিলের লুটের অভিযোগ, মামলা হলেও গ্রেপ্তার নেই,আতঙ্কে ভুক্তভোগী পরিবার! গণপূর্তে লটারির আড়ালে বদলি-বাণিজ্যের অভিযোগ!দুই সারোয়ারের’ ভূমিকা নিয়ে তোলপাড়, গুরুত্বপূর্ণ পদে বিতর্কিতদের পুনর্বাসনের প্র জুলাইপন্থী প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেনের পদত্যাগ পুনর্বিবেচনা চায় জেজেইউ ৭৫ লাখ টাকা চাঁদাবাজি নয়, জমি ও রাস্তা নিয়ে চুক্তি- মাহমুদুর রহমানের প্রতিবাদ! বরিশালে সওজের কম্পিউটার অপারেটর ফারুককে ঘিরে সম্পদের হিসাব নিয়ে প্রশ্ন, একাধিক জমি-ভবনের তথ্য সামনে

গণমাধ্যমের পুরোনো সিংহাসনে আবার বসার চেষ্টা? ডিবিসি কাণ্ডে ইকবাল সোবহান, পর্দার আড়ালের সাংবাদিকতা ও ক্ষমতার পুরোনো খেলোয়াড়দের নিয়ে তোলপাড়!

প্রতিনিধির নাম
  • আপডেট সময় : ০১:৫৫:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬ ৩৪ বার পড়া হয়েছে
অনলাইনের সর্বশেষ নিউজ পেতে অনুসরণ করুন গুগল নিউজ (Google News) ফিডটি

ক্ষমতা বদলেছে, চেয়ার বদলেছে, সরকারের নাম বদলেছে,কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষমতার নেশা কি এখনো কাটেনি? সাংবাদিকতা, নাকি ক্ষমতার বারান্দায় বসে প্রভাব বিস্তারের পুরোনো ব্যবসা?

নিজস্ব প্রতিবেদক।। রাজধানীর ডিবিসি নিউজ কার্যালয়ে ৪ নভেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বহুল বিতর্কিত একটি অধ্যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা, সাংবাদিক নেতা ও ডিবিসির সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ঘিরে কার্যালয়ে উত্তেজনা এবং পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হস্তক্ষেপ,পুরো ঘটনাটি এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইকবাল সোবহান চৌধুরীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সাংবাদিকের ডিবিসি কার্যালয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে থাকা কয়েকজনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরে ডিবি তাকে হেফাজতে নেয়। এ ঘটনায় প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, কারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কারা ভেতর থেকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল কি না,এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

তবে ঘটনাটি দেখে একটি প্রশ্ন সামনে আসতেই পারে,গণমাধ্যম কি আবারও পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কোনো পরীক্ষামূলক মঞ্চ হয়ে উঠছে?

ইকবাল সোবহান-সাংবাদিকতার পরিচয়, রাজনীতির ঘনিষ্ঠতা আর ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া!

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের পরিচিত মুখ। কিন্তু তার পরিচয় শুধু সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শেখ হাসিনার সরকারের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-২ আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচনও করেছিলেন।

অর্থাৎ একদিকে সাংবাদিকতার নেতৃত্ব, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার পদ এবং সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ,সব মিলিয়ে তার অবস্থান ছিল বেশ প্রভাবশালী।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতা,দুটিকে একই সঙ্গে ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা কতটা অক্ষুণ্ন ছিল?

সাংবাদিকতার চেয়ার যদি ক্ষমতার দরজায় প্রবেশের পাস হয়ে যায়, তাহলে জনগণের পক্ষে কথা বলবে কে? আর সম্পাদকীয় স্বাধীনতা যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের কাছে জিম্মি হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যম আর প্রচারমাধ্যমের পার্থক্য কোথায়?

১৭ বছরের শাসনামল-গণমাধ্যম কি ছিল স্বাধীন, নাকি ছিল নিয়ন্ত্রিত?

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দেশ-বিদেশে বহু সমালোচনা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, সংবাদ প্রকাশে চাপ, সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।

সেই সময়ে সরকারের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সম্পাদকদের সংগঠন ‘এডিটরস গিল্ড’ এবং প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, যারা তখন ক্ষমতার এত কাছাকাছি ছিলেন, তারা কি কখনো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন? নাকি ক্ষমতার বারান্দায় বসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সংজ্ঞাটাই সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছিলেন?

অবশ্যই, কোনো সংগঠনের সদস্য হওয়া বা সরকারের উপদেষ্টা থাকা অপরাধ নয়। কিন্তু গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের সময় প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতাদের ভূমিকা ইতিহাসের কাছে জবাবদিহির বিষয়।

লাইসেন্স, সরকারি বিজ্ঞাপন, প্লট ও সম্পদের প্রশ্ন- তদন্ত হবে কি?

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গণমাধ্যমের লাইসেন্স, সরকারি বিজ্ঞাপন, টেলিভিশন অনুমোদন এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বহুবার আলোচনায় এসেছে।

ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ঘিরেও গণমাধ্যমের অনুমোদন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক লেনদেন এবং ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ প্রচারিত হয়েছে।

ঢাকার গুলশান, বনানী ও মহাখালীর মতো অভিজাত এলাকায় সম্পদের বিষয়ে যেসব দাবি সামনে এসেছে, সেগুলোর প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সম্পদ বিবরণী, ভূমি নিবন্ধন, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা অবস্থায় কারও সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে কি না, ঘটলে তার বৈধ উৎস কী?এখানে কারও বিরুদ্ধে আগাম রায় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। কারণ দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে পরিচয় নয়, নথিই শেষ কথা।

২৪ জুলাইয়ের গণভবন বৈঠক- আন্দোলন দমনের পরামর্শ, নাকি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা?

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারের সঙ্গে সাংবাদিক নেতাদের যোগাযোগ ও গণভবনের বৈঠক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

২৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাংবাদিকদের একটি বৈঠকের কথা আলোচনায় এসেছে। সেই বৈঠকে কারা উপস্থিত ছিলেন, কী আলোচনা হয়েছিল, আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে কী পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল এবং ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ভূমিকা কী ছিল,এসব তথ্য নির্ভরযোগ্য ভিডিও, নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা জরুরি।

যদি কোনো সাংবাদিক নেতা আন্দোলন দমনে দমনমূলক পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন।

কারণ সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতাসীনকে খুশি করা নয়, ক্ষমতার অন্যায়কে প্রশ্ন করা। জনগণের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরা, জনগণের কণ্ঠস্বর বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া নয়

 

জুলাই হত্যা মামলায় নাম-অভিযোগের বিচার হোক আদালতে!

ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত একটি হত্যা মামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি সামনে এসেছে। মামলায় নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হ। তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হততবে আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং সাংবাদিক নেতাদের যোগাযোগের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।কেউ সাংবাদিক, কেউ সম্পাদক, কেউ সাবেক উপদেষ্টা,এসব পরিচয় আইনের ঊর্ধ্বে থাকার কোনো সনদ নয়।

 

ডিবিসি কাণ্ড-পুরোনো খেলোয়াড়দের কি আবারও নতুন মাঠের প্রয়োজন?

এবার আসা যাক মূল ঘটনায়,যদি ডিবিসি কার্যালয়ে কোনো গোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গিয়ে থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নির্ধারণের নিজস্ব আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে।

কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীতের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে একটি সংবাদমাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ব্যঙ্গের বিষয় হলো, যে সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছিল, সেই সময়ের ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই যদি এখন আবার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় আসেন, তাহলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবেই।

এ কি সাংবাদিকতার পুনর্জাগরণ, নাকি পুরোনো ক্ষমতার চেয়ারটি আবার খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা?

ক্ষমতা চলে গেছে, কিন্তু ক্ষমতার অভ্যাস কি এখনো রয়ে গেছে?

শুধু সরকার বদলালে ব্যবস্থা বদলায় না, ডিবিসি কার্যালয়ের ঘটনাটি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। অতীতের রাজনৈতিক প্রভাববলয়, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম কিংবা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি যদি নতুন বাস্তবতায়ও সক্রিয় থাকে, তাহলে শুধু ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

তবে মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হলেই কেউ অপরাধী নয়। আবার বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ দায়মুক্ত নয়।

আজ যারা পুরোনো ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, কাল নতুন ক্ষমতার ছায়ায় অন্য কেউ একই কাজ করলে তার বিরুদ্ধেও একই প্রশ্ন উঠবে।আমরা কোনো দলের সাংবাদিকতা চাই না। চাই না ক্ষমতাসীনদের পক্ষে তোষামোদির বিনিময়ে লাইসেন্স বিজ্ঞাপন কিংবা সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতি। চাই না সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা।

 

সাংবাদিকতা যদি ক্ষমতার দালালি করার পেশা হয়ে যায়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের দরজায় জনগণের জন্য আর জায়গা কোথায় থাকবে?

ডিবিসি কার্যালয়ের ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাইরে কারা কীভাবে যুক্ত ছিলেন,সবকিছুর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

পুরোনো হোক কিংবা নতুন, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকা কোনো সাংবাদিক গোষ্ঠীকে গণমাধ্যমের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

আজাদ বাণীর অবস্থান পরিষ্কার,সাংবাদিকতা কোনো দলের উত্তরাধিকার নয়, কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নয়। ক্ষমতার পালাবদলে যারা শুধু লেবাস বদলায়, তাদের নয়; জনগণের কাছে জবাবদিহি করে এমন সাংবাদিকতাই প্রতিষ্ঠিত হোক।

কারণ চেয়ার বদলালেই চরিত্র বদলায় না। আর ক্ষমতার রং বদলালেই অতীতের হিসাব মুছে যায় না!

 

নিউজটি শেয়ার করুন

আপনার মন্তব্য

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল এবং অন্যান্য তথ্য সংরক্ষন করুন

আপলোডকারীর তথ্য

গণমাধ্যমের পুরোনো সিংহাসনে আবার বসার চেষ্টা? ডিবিসি কাণ্ডে ইকবাল সোবহান, পর্দার আড়ালের সাংবাদিকতা ও ক্ষমতার পুরোনো খেলোয়াড়দের নিয়ে তোলপাড়!

আপডেট সময় : ০১:৫৫:২০ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৫ নভেম্বর ২০২৬

ক্ষমতা বদলেছে, চেয়ার বদলেছে, সরকারের নাম বদলেছে,কিন্তু কিছু মানুষের ক্ষমতার নেশা কি এখনো কাটেনি? সাংবাদিকতা, নাকি ক্ষমতার বারান্দায় বসে প্রভাব বিস্তারের পুরোনো ব্যবসা?

নিজস্ব প্রতিবেদক।। রাজধানীর ডিবিসি নিউজ কার্যালয়ে ৪ নভেম্বরের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন করে আলোচনায় এসেছে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বহুল বিতর্কিত একটি অধ্যায়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার তথ্য উপদেষ্টা, সাংবাদিক নেতা ও ডিবিসির সাবেক চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ঘিরে কার্যালয়ে উত্তেজনা এবং পরবর্তী সময়ে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) হস্তক্ষেপ,পুরো ঘটনাটি এখন নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইকবাল সোবহান চৌধুরীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সাংবাদিকের ডিবিসি কার্যালয়ে যাওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি হয়। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে থাকা কয়েকজনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। পরে ডিবি তাকে হেফাজতে নেয়। এ ঘটনায় প্রকৃত উদ্দেশ্য কী ছিল, কারা উদ্যোগ নিয়েছিলেন, কারা ভেতর থেকে সহযোগিতা করেছিলেন এবং কোনো প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছিল কি না,এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে।

তবে ঘটনাটি দেখে একটি প্রশ্ন সামনে আসতেই পারে,গণমাধ্যম কি আবারও পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাববলয়ের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার কোনো পরীক্ষামূলক মঞ্চ হয়ে উঠছে?

ইকবাল সোবহান-সাংবাদিকতার পরিচয়, রাজনীতির ঘনিষ্ঠতা আর ক্ষমতার দীর্ঘ ছায়া!

ইকবাল সোবহান চৌধুরী বাংলাদেশের সাংবাদিকতা জগতের পরিচিত মুখ। কিন্তু তার পরিচয় শুধু সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ নয়। তিনি শেখ হাসিনার সরকারের প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। ২০০৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-২ আসনে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীকে নির্বাচনও করেছিলেন।

অর্থাৎ একদিকে সাংবাদিকতার নেতৃত্ব, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টার পদ এবং সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ,সব মিলিয়ে তার অবস্থান ছিল বেশ প্রভাবশালী।

সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আর রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ঘনিষ্ঠতা,দুটিকে একই সঙ্গে ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতা কতটা অক্ষুণ্ন ছিল?

সাংবাদিকতার চেয়ার যদি ক্ষমতার দরজায় প্রবেশের পাস হয়ে যায়, তাহলে জনগণের পক্ষে কথা বলবে কে? আর সম্পাদকীয় স্বাধীনতা যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের কাছে জিম্মি হয়, তাহলে সংবাদমাধ্যম আর প্রচারমাধ্যমের পার্থক্য কোথায়?

১৭ বছরের শাসনামল-গণমাধ্যম কি ছিল স্বাধীন, নাকি ছিল নিয়ন্ত্রিত?

আওয়ামী লীগ সরকারের দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে দেশ-বিদেশে বহু সমালোচনা হয়েছে। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা, সংবাদ প্রকাশে চাপ, সম্পাদকীয় নিয়ন্ত্রণ এবং রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ বারবার সামনে এসেছে।

সেই সময়ে সরকারের ঘনিষ্ঠ সাংবাদিক নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে সম্পাদকদের সংগঠন ‘এডিটরস গিল্ড’ এবং প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বদের রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে নানা বিতর্ক তৈরি হয়েছিল।

এখন প্রশ্ন হলো, যারা তখন ক্ষমতার এত কাছাকাছি ছিলেন, তারা কি কখনো গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিলেন? নাকি ক্ষমতার বারান্দায় বসে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার সংজ্ঞাটাই সুবিধামতো ব্যাখ্যা করেছিলেন?

অবশ্যই, কোনো সংগঠনের সদস্য হওয়া বা সরকারের উপদেষ্টা থাকা অপরাধ নয়। কিন্তু গণমাধ্যমের ওপর রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণের অভিযোগের সময় প্রভাবশালী সাংবাদিক নেতাদের ভূমিকা ইতিহাসের কাছে জবাবদিহির বিষয়।

লাইসেন্স, সরকারি বিজ্ঞাপন, প্লট ও সম্পদের প্রশ্ন- তদন্ত হবে কি?

আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গণমাধ্যমের লাইসেন্স, সরকারি বিজ্ঞাপন, টেলিভিশন অনুমোদন এবং বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা বণ্টনে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ বহুবার আলোচনায় এসেছে।

ইকবাল সোবহান চৌধুরীকে ঘিরেও গণমাধ্যমের অনুমোদন, সরকারি সুযোগ-সুবিধা, আর্থিক লেনদেন এবং ব্যক্তিগত সম্পদ নিয়ে বিভিন্ন অভিযোগ প্রচারিত হয়েছে।

ঢাকার গুলশান, বনানী ও মহাখালীর মতো অভিজাত এলাকায় সম্পদের বিষয়ে যেসব দাবি সামনে এসেছে, সেগুলোর প্রকৃত সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সম্পদ বিবরণী, ভূমি নিবন্ধন, আয়কর নথি এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা অবস্থায় কারও সম্পদের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি ঘটেছে কি না, ঘটলে তার বৈধ উৎস কী?এখানে কারও বিরুদ্ধে আগাম রায় দেওয়ার প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন নিরপেক্ষ তদন্ত। কারণ দুর্নীতির অভিযোগের ক্ষেত্রে পরিচয় নয়, নথিই শেষ কথা।

২৪ জুলাইয়ের গণভবন বৈঠক- আন্দোলন দমনের পরামর্শ, নাকি পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা?

২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় সরকারের সঙ্গে সাংবাদিক নেতাদের যোগাযোগ ও গণভবনের বৈঠক নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তোলার অবকাশ রয়েছে।

২৪ জুলাই গণভবনে শেখ হাসিনার সঙ্গে সাংবাদিকদের একটি বৈঠকের কথা আলোচনায় এসেছে। সেই বৈঠকে কারা উপস্থিত ছিলেন, কী আলোচনা হয়েছিল, আন্দোলনের পরিস্থিতি নিয়ে কী পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল এবং ইকবাল সোবহান চৌধুরীর ভূমিকা কী ছিল,এসব তথ্য নির্ভরযোগ্য ভিডিও, নথি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে প্রকাশ করা জরুরি।

যদি কোনো সাংবাদিক নেতা আন্দোলন দমনে দমনমূলক পদক্ষেপের পরামর্শ দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটি শুধু রাজনৈতিক বিতর্ক নয়, সাংবাদিকতার নৈতিকতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন।

কারণ সাংবাদিকের কাজ ক্ষমতাসীনকে খুশি করা নয়, ক্ষমতার অন্যায়কে প্রশ্ন করা। জনগণের কণ্ঠস্বরকে তুলে ধরা, জনগণের কণ্ঠস্বর বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া নয়

 

জুলাই হত্যা মামলায় নাম-অভিযোগের বিচার হোক আদালতে!

ইকবাল সোবহান চৌধুরীর বিরুদ্ধে জুলাই আন্দোলনসংক্রান্ত একটি হত্যা মামলায় সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ ও গ্রেপ্তারের বিষয়টি সামনে এসেছে। মামলায় নাম থাকা মানেই অপরাধ প্রমাণিত হ। তদন্ত, সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই সত্য প্রতিষ্ঠিত হততবে আন্দোলনের সময় রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণ, গণমাধ্যমের ভূমিকা এবং সাংবাদিক নেতাদের যোগাযোগের বিষয়গুলোও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।কেউ সাংবাদিক, কেউ সম্পাদক, কেউ সাবেক উপদেষ্টা,এসব পরিচয় আইনের ঊর্ধ্বে থাকার কোনো সনদ নয়।

 

ডিবিসি কাণ্ড-পুরোনো খেলোয়াড়দের কি আবারও নতুন মাঠের প্রয়োজন?

এবার আসা যাক মূল ঘটনায়,যদি ডিবিসি কার্যালয়ে কোনো গোষ্ঠী প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে গিয়ে থাকে, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর বিষয়। একটি গণমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিকানা, ব্যবস্থাপনা ও সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত নির্ধারণের নিজস্ব আইনগত ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো রয়েছে।

কোনো রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা অতীতের ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে একটি সংবাদমাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

ব্যঙ্গের বিষয় হলো, যে সময় গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছিল, সেই সময়ের ক্ষমতাকেন্দ্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরাই যদি এখন আবার গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আলোচনায় আসেন, তাহলে মানুষের মনে প্রশ্ন জাগবেই।

এ কি সাংবাদিকতার পুনর্জাগরণ, নাকি পুরোনো ক্ষমতার চেয়ারটি আবার খুঁজে বেড়ানোর চেষ্টা?

ক্ষমতা চলে গেছে, কিন্তু ক্ষমতার অভ্যাস কি এখনো রয়ে গেছে?

শুধু সরকার বদলালে ব্যবস্থা বদলায় না, ডিবিসি কার্যালয়ের ঘটনাটি সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কসংকেত। অতীতের রাজনৈতিক প্রভাববলয়, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম কিংবা গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি যদি নতুন বাস্তবতায়ও সক্রিয় থাকে, তাহলে শুধু ক্ষমতার পালাবদল দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না।

তবে মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ হলেই কেউ অপরাধী নয়। আবার বিএনপি, জামায়াত কিংবা অন্য কোনো রাজনৈতিক পরিচয় থাকলেই কেউ দায়মুক্ত নয়।

আজ যারা পুরোনো ক্ষমতার দাপট দেখিয়েছেন, কাল নতুন ক্ষমতার ছায়ায় অন্য কেউ একই কাজ করলে তার বিরুদ্ধেও একই প্রশ্ন উঠবে।আমরা কোনো দলের সাংবাদিকতা চাই না। চাই না ক্ষমতাসীনদের পক্ষে তোষামোদির বিনিময়ে লাইসেন্স বিজ্ঞাপন কিংবা সুবিধা আদায়ের সংস্কৃতি। চাই না সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রতিযোগিতা।

 

সাংবাদিকতা যদি ক্ষমতার দালালি করার পেশা হয়ে যায়, তাহলে সংবাদমাধ্যমের দরজায় জনগণের জন্য আর জায়গা কোথায় থাকবে?

ডিবিসি কার্যালয়ের ঘটনার প্রকৃত উদ্দেশ্য, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা এবং প্রতিষ্ঠানের ভেতরে-বাইরে কারা কীভাবে যুক্ত ছিলেন,সবকিছুর নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।

পুরোনো হোক কিংবা নতুন, ক্ষমতার ছত্রছায়ায় থাকা কোনো সাংবাদিক গোষ্ঠীকে গণমাধ্যমের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

আজাদ বাণীর অবস্থান পরিষ্কার,সাংবাদিকতা কোনো দলের উত্তরাধিকার নয়, কোনো সরকারের ব্যক্তিগত সম্পত্তিও নয়। ক্ষমতার পালাবদলে যারা শুধু লেবাস বদলায়, তাদের নয়; জনগণের কাছে জবাবদিহি করে এমন সাংবাদিকতাই প্রতিষ্ঠিত হোক।

কারণ চেয়ার বদলালেই চরিত্র বদলায় না। আর ক্ষমতার রং বদলালেই অতীতের হিসাব মুছে যায় না!