সুনামের ঢাল, নাকি প্রশ্নের মুখোমুখি চিকিৎসা?
- আপডেট সময় : ০১:২৮:৪৯ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ৯৪ বার পড়া হয়েছে

প্রসূতির মৃত্যুর পর উঠছে একের পর এক প্রশ্ন, সামাজিক মাধ্যমে পাল্টা প্রচারণায় বাড়ছে বিতর্ক!
মেহরাজ রাব্বি।। একজন প্রসূতির মৃত্যুর পর যখন একটি পরিবারের স্বপ্ন মুহূর্তেই শোকে পরিণত হয়, তখন প্রশ্নের উত্তর খোঁজাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই প্রশ্নের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে যদি সামনে আসে ‘সুনাম’ শুভাকাঙ্ক্ষী’ আর ‘অপপ্রচার’ এর গল্প-তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আরও কিছু প্রশ্ন জন্ম নেয়।
বরিশালের রাহাত-আনোয়ার হাসপাতালে নাজিয়া রহমান মাইশা নামে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনাকে ঘিরে চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ উঠেছে। গত ২৪ সেপ্টেম্বর সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের পর তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরবর্তীতে তাঁর মৃত্যু হয় বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, অস্ত্রোপচারের আগে ও পরে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, রোগীর অবস্থার অবনতি হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল,এসব প্রশ্নের উত্তর এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।কিন্তু প্রশ্নের জবাবের বদলে সামনে এসেছে ভিন্ন এক বয়ান-ডা. তহুরার সুনাম নিয়ে ঈর্ষা’অপপ্রচার, ‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ ইত্যাদি।
প্রশ্ন হলো,একজন রোগীর মৃত্যুর পর সুনামের গল্প আগে,নাকি মৃত্যুর কারণের তদন্ত আগে?
সুনামের সার্টিফিকেটে কি মৃত্যুর কারণ মুছে যায়? ডা. তহুরার দীর্ঘদিনের রোগীদের কেউ কেউ তাঁর চিকিৎসাসেবা নিয়ে ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। সেটি তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-এবং তা অবশ্যই তাঁদের বক্তব্য হিসেবে বিবেচ্য।কিন্তু একজন চিকিৎসকের অতীতের ভালো অভিজ্ঞতা দিয়ে একটি নির্দিষ্ট রোগীর মৃত্যুর ঘটনা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না।আজ কারও চিকিৎসায় ভালো ফল হয়েছে,এটি সত্য হতে পারে। আবার অন্য একটি ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে,এটিও সত্য হতে পারে।দুটিকে একসঙ্গে তদন্তের আওতায় আনাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা।কারণ ‘আমার দুইবার ভালো চিকিৎসা হয়েছে’ এই বক্তব্য কোনো নির্দিষ্ট চিকিৎসা–অভিযোগের তদন্তের বিকল্প নয়।
তাহলে তদন্তে আপত্তি কোথায়?
যদি অভিযোগ ভিত্তিহীন হয়, তাহলে তদন্ত হোক।যদি চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি না থাকে, তাহলে নথি-প্রমাণের মাধ্যমে সেটিই সামনে আসুক।আর যদি কোনো অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তাহলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।এখানে অঙ্কটা খুব সহজ,অভিযোগের জবাব বিজ্ঞাপন দিয়ে নয়, প্রমাণ দিয়ে দিতে হয়।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে কাকে পছন্দ করেন, কে কার দীর্ঘদিনের রোগী,কে চিকিৎসককে ‘মানবিক’ মনে করেন,এসবের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো রোগীর চিকিৎসা-নথি, অস্ত্রোপচারের রেকর্ড, চিকিৎসার সিদ্ধান্ত এবং বিশেষজ্ঞ মূল্যায়ন।
অপপ্রচার বললেই কি অভিযোগ শেষ?
ডা. তহুরার রোগী ও পরিচিতজনদের একটি অংশ দাবি করছেন, ঈর্ষা থেকে তাঁর বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।এটি তাঁদের বক্তব্য,কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে,কে ঈর্ষা করছে, কেন করছে এবং কী উদ্দেশ্যে করছে,তার প্রমাণ কোথায়?
অন্যদিকে রোগীর পরিবার যদি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ করে থাকে, সেই অভিযোগেরও প্রমাণ ও নথি যাচাই করতে হবে।অর্থাৎ একদিকে ‘অপপ্রচার’ শব্দটি দিয়ে অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, অন্যদিকে অভিযোগ উঠলেই চিকিৎসককে অপরাধী বানানোও যাবে না।সত্য বের করার একমাত্র পথ,নিরপেক্ষ তদন্ত।
রোগী মারা গেলে গল্প নয়, উত্তর দরকার!
একটি প্রসূতির মৃত্যু কোনো সাধারণ ঘটনা নয়। একজন নারী হাসপাতালে গিয়েছিলেন চিকিৎসা নিতে। তাঁর পরিবার আশা করেছিল তিনি সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন।তিনি আর ফেরেননি।এখন পরিবারের প্রশ্ন থাকতেই পারে,কী হয়েছিল? কেন হয়েছিল? কোথায় জটিলতা তৈরি হয়েছিল? চিকিৎসার কোনো সিদ্ধান্ত কি ঘটনাটিকে প্রভাবিত করেছিল?এসব প্রশ্নকে ‘অপপ্রচার’ বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।আবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টকে চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবেও গ্রহণ করা যায় না।মৃত্যুর সত্য জানতে হলে আবেগ নয়, নথি খুলতে হবে।
সুনাম থাকলে তদন্ত আরও সহজ হওয়া উচিত!
কেউ দীর্ঘদিন ভালো চিকিৎসাসেবা দিয়ে থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্তে সেটিই বরং সহায়ক হতে পারে। কারণ তদন্তে অতীতের রেকর্ড, চিকিৎসা-সেবা এবং বর্তমান ঘটনার মধ্যে পার্থক্য পরিষ্কার করা সম্ভব।তাই সুনাম আছে-এই যুক্তিতে তদন্তের প্রয়োজন নেই, এমন ধারণা যেমন ভুল, তেমনি ‘অভিযোগ উঠেছে-তাই অভিযোগ সত্য, এমন ধারণাও ভুল।
সুনাম আদালত নয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও আদালত নয়।সত্য নির্ধারণ করবে প্রমাণ।প্রশ্নের জায়গাটা এখানেই,রোগীর মৃত্যু হলো,তারপর শুরু হলো সুনামের হিসাব।কেউ বললেন, ‘আমার চিকিৎসা ভালো হয়েছে।কেউ বললেন, ‘তিনি খুব মানবিক।কেউ বললেন, ‘এটা অপপ্রচার।কেউ আবার বললেন, ‘ঈর্ষা থেকেই এসব।কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি যেন মাঝখানেই হারিয়ে যাচ্ছে,নাজিয়া রহমান মাইশার চিকিৎসায় আসলে কী ঘটেছিল?এই প্রশ্নের উত্তর কোনো প্রশংসাপত্রে নেই। কোনো ফেসবুক পোস্টেও নেই। কোনো পক্ষের আবেগী বক্তব্যেও নেই।উত্তর আছে চিকিৎসা-নথিতে, তদন্তে এবং প্রমাণে।
দাবি একটাই-সত্য সামনে আসুক!
নাজিয়া রহমান মাইশার মৃত্যুর ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত হোক। রোগীর পরিবারের অভিযোগ যাচাই করা হোক। চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া হোক। প্রয়োজন হলে স্বাধীন বিশেষজ্ঞ মতামত নেওয়া হোক।চিকিৎসায় অবহেলা প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।আর অভিযোগ ভিত্তিহীন প্রমাণিত হলে সেটিও স্পষ্টভাবে জানানো হোক।কারণ কাউকে বাঁচানোর জন্য সত্যকে চাপা দেওয়া যেমন সাংবাদিকতা নয়, তেমনি কাউকে দোষী বানানোর জন্য প্রমাণ ছাড়া অভিযোগ ছড়ানোও সাংবাদিকতা নয়।রোগীর মৃত্যুর পর সবচেয়ে জরুরি বিষয় কোনো চিকিৎসকের সুনাম নয়-সত্যটা কী, সেটি জানা।
আর সেই সত্য বের করার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হলো,প্রচার নয়, তদন্ত।পক্ষপাত নয়, প্রমাণ।ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, তথ্য।























