রাজস্ ফাঁকি ও কর্মকর্তাদের ওপর হামলার অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর মামলা, সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধের অপচেষ্টা কি না, উঠছে প্রশ্ন!
নিজস্ব প্রতিবেদক।। অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশের পর দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের সম্পাদক ও প্রকাশক মেহেদী হাসান এবং ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মো. রেজানুর ইসলামের বিরুদ্ধে দায়ের করা ২০ লাখ টাকার কথিত চাঁদাবাজি মামলায় জামিন মঞ্জুর করেছেন আদালত। সোমবার (২৬ অক্টোবর) বিকেলে ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতের বিচারক আল বিরুনী মীর দীর্ঘ শুনানি শেষে তাঁদের জামিন মঞ্জুর করেন।
মামলার বাদী গাজীপুরের হোটেল ব্যবসায়ী হাবিবুর রহমান। তবে সংবাদপত্রটির পক্ষ থেকে মামলাটিকে প্রকাশিত সংবাদের জেরে দায়ের করা হয়রানিমূলক মামলা বলে দাবি করা হয়েছে। ফলে ঘটনাটি ঘিরে সাংবাদিকদের স্বাধীনতা,অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার নিরাপত্তা এবং মামলা দায়েরের পেছনের উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সংবাদ, এরপরই চাঁদাবাজির মামলা!
প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজীপুরের হাবিবুর রহমান ওরফে ‘পল্টি হাবিব’-এর বিরুদ্ধে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি, নানা অনিয়ম এবং দুই কর্মকর্তার ওপর হামলার অভিযোগসংক্রান্ত তথ্য তুলে ধরে সংবাদ প্রকাশ করে দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিন।
সংবাদ প্রকাশের পরপরই দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয় বলে সংবাদপত্রটির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। মামলায় রাজধানীর কাকরাইল মোড়ে অস্ত্র ঠেকিয়ে চাঁদা দাবির অভিযোগ আনা হয়েছে।
তবে অভিযোগের সত্যতা, ঘটনার প্রেক্ষাপট এবং সংবাদ প্রকাশের সঙ্গে মামলার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না,এসব বিষয় নিরপেক্ষ তদন্ত ও আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ায় যাচাই হওয়া জরুরি। অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী বলা যায় না; একইভাবে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে মামলা হলেই সেটিকে প্রমাণ ছাড়া মিথ্যা বলেও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া যায় না।
তদন্ত ছাড়াই ওয়ারেন্ট-আইনপ্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন!
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট আদালত তদন্ত ছাড়াই দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এ ঘটনায় সাংবাদিক মহলের একাংশ প্রশ্ন তুলেছে, অভিযোগের যথাযথ যাচাই এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণের বিষয়টি কীভাবে বিবেচনা করা হয়েছিল?
অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া বিচারিক প্রক্রিয়ার অংশ হলেও, সেই প্রক্রিয়ায় ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে সংবাদ প্রকাশের পর সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ উঠলে, অভিযোগের গ্রহণযোগ্যতা এবং ঘটনার প্রকৃত প্রেক্ষাপট নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার দাবি আরও জোরালো হয়।
সাংবাদিকদের পাশে বিএমএসএফ!
দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার প্রতিবাদ জানিয়ে শুরু থেকেই সোচ্চার রয়েছে বাংলাদেশ মফস্বল সাংবাদিক ফোরাম (বিএমএসএফ)। আদালতে তাঁদের পক্ষে আইনি লড়াই পরিচালনা করেন সংগঠনটির কেন্দ্রীয় কমিটির আইন উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট কাওসার হোসাইন, অ্যাডভোকেট আব্দুর রাজ্জাক, অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান ও অ্যাডভোকেট মশিউর রহমান।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন বিএমএসএফের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান এবং সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি আহমেদ আবু জাফর।
তিনি বলেন, সংবাদ প্রকাশে ক্ষুব্ধ হয়ে কেউ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করতেই পারেন। কিন্তু কোনো প্রকার তদন্ত ছাড়াই সরাসরি ওয়ারেন্ট জারি করার বিষয়টি কতটা আইনসিদ্ধ, তা নিয়ে জাতির কাছে প্রশ্ন রাখতে চাই।
সাংবাদিক নেতারা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, সত্য প্রকাশের কারণে কোনো সাংবাদিককে হয়রানি করা হলে সাংবাদিক সমাজ ঐক্যবদ্ধভাবে তার প্রতিবাদ জানাবে।
‘মামলা-হুমকিতে সত্যের অগ্রযাত্রা থামানো যাবে না’
জামিন পাওয়ার পর দৈনিক অগ্রযাত্রা প্রতিদিনের সম্পাদক ও প্রকাশক মেহেদী হাসান বলেন, সাংবাদিকদের কলম ও অনুসন্ধানী দৃষ্টি থামিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এ ধরনের বানোয়াট ও হয়রানিমূলক মামলা করা হয়েছে বলে তাঁরা মনে করেন।
তিনি বলেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার থাকা এবং সত্য প্রকাশ করাই সাংবাদিকদের কাজ। মিথ্যা মামলা কিংবা হুমকি-ধমকি দিয়ে সত্যের অগ্রযাত্রা থামিয়ে রাখা যাবে না।
প্রশ্ন এখন সাংবাদিকতার স্বাধীনতা নিয়ে!
গত ২৭ আগস্ট হাবিবুর রহমান দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা চাঁদাবাজির অভিযোগে মামলাটি দায়ের করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। মামলায় কাকরাইল মোড়ে অস্ত্রের মুখে চাঁদা দাবির অভিযোগ আনা হয়।
একদিকে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে সংবাদ প্রকাশ, অন্যদিকে সেই সংবাদমাধ্যমের দুই সম্পাদকের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজির মামলা,ঘটনাপ্রবাহটি স্বাভাবিকভাবেই জনস্বার্থে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। তবে অভিযোগের পক্ষে-বিপক্ষে প্রমাণ, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য এবং আদালতের পরবর্তী কার্যক্রমই শেষ পর্যন্ত প্রকৃত সত্য নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সাংবাদিকতার কাজ কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে অযথা হয়রানি করা নয়; আবার ক্ষমতাবান কিংবা প্রভাবশালী কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তা অনুসন্ধান ও প্রকাশের পথও বন্ধ হওয়া উচিত নয়। মামলার আড়ালে যদি সাংবাদিকতার কণ্ঠরোধের চেষ্টা থেকে থাকে, তবে তা যেমন উদ্বেগজনক, তেমনি অভিযোগের নিরপেক্ষ বিচার নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
সত্য উদ্ঘাটন,আইনের শাসন এবং স্বাধীন সাংবাদিকতা,এই তিনটির সুরক্ষা নিশ্চিত করাই এখন সময়ের দাবি।