বিল আটকে রাখা, দরপত্রে কারসাজি, কথিত ৩৫ লাখ টাকার লেনদেন ও নিম্নমানের নির্মাণকাজের অভিযোগ ‘ফ্যাসিবাদী ঘনিষ্ঠ’ পরিচয়ে প্রভাব বিস্তারকারী কিছু সাংবাদিকের ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ ঠিকাদারদের!

 

অনুসন্ধানী প্রতিবেদন।।সরকারী অর্থেশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ, শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ শ্রেণিকক্ষ নিশ্চিত করা একারিগরি শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়নের দায়িত্ব শিক্ষা

 

প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি)। কিন্তু সেই অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামকে ঘিরে ঘুষ-কমিশন বাণিজ্য, দরপত্রে প্রভাব বিস্তার, বিল আটকে রাখা, নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া, নিরাপত্তা জামানত নিয়ে অনিয়ম এবং সরকারি প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, ২৪ জন ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ ও প্রতিবাদের পরও তাঁরা প্রত্যাশিত প্রতিকার পাননি,বরং দপ্তরকেন্দ্রিক একটি কথিত প্রভাবশালী বলয়ের কারণে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ও স্বচ্ছতা প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অভিযোগের সঙ্গে আরও যুক্ত হয়েছে কিছু সাংবাদিকের ভূমিকা নিয়ে বিতর্ক,অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, অতীতে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু সাংবাদিক নিজেদের পরিচিতি ও প্রভাব ব্যবহার করে নির্বাহী প্রকৌশলীকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কথিত বলয়ের সঙ্গে সখ্য বজায় রাখছেন এবং দরপত্রের নাম ব্যবহার করে ঠিকাদারদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা আর্থিক নথি, লেনদেনের প্রমাণ কাউকে অপরাধী বা দুর্নীতির অংশীদার হিসেবে চূড়ান্তভাবে চিহ্নিত না করে অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ও সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্য নেওয়া জরুরি। ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, কাজ পাওয়া, কার্যাদেশ বাস্তবায়ন, নির্মাণকাজের পরিমাপ, বিল অনুমোদন এবং নিরাপত্তা জামানত ফেরত,সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার গুরুত্বপূর্ণ ধাপগুলোতে নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ের প্রভাব রয়েছে। তাঁদের অভিযোগ, কথিত অনৈতিক দাবি মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানালে কোনো কোনো ঠিকাদারের বিল বা ফাইল আটকে রাখা হয়, নতুন করে কাগজপত্র চাওয়া হয় কিংবা কাজের পরিমাপ নিয়ে আপত্তি তোলা হয়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদারের বক্তব্য হিসেবে অভিযোগের উপাদানে উল্লেখ রয়েছে, এখানে কাজ করতে হলে দুইটা জিনিস লাগে,ধৈর্য আর টাকা। টাকা না দিলে ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়।” কাজ সম্পন্ন করার পরও বিল পেতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় বলে অভিযোগকারীদের দাবি। এতে ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের মজুরি এবং নির্মাণসামগ্রীর বকেয়া পরিশোধে চাপ তৈরি হয় বলে তাঁরা জানিয়েছেন। তবে বিল ছাড়ে বিলম্বের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে বিল দাখিলের তারিখ, ফাইলের নথিভুক্ত গতিপথ, আপত্তির লিখিত কারণ, কাজের পরিমাপ বই ও অনুমোদনসংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করা প্রয়োজন। দপ্তরটিকে ঘিরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ হলো, নির্দিষ্ট কয়েকটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ নেওয়া এবং পরে অন্য ঠিকাদারদের কাছে কাজের অংশ হস্তান্তরের কথিত ব্যবস্থা।

 

অভিযোগকারীদের একাংশ বরিশালের মেসার্স মোমিন সিকদার, দিনাজপুরের মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, চট্টগ্রামের ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং খুলনার মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্সের নাম উল্লেখ করেছেন। তাঁদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কার্যাদেশ নেওয়ার পর অন্য ঠিকাদারদের দিয়ে কাজ করানোর ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে বাস্তবে কাজ করা ঠিকাদারদের মূল কার্যাদেশধারী প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করতে হয়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বিল, জামানত ফেরত ও ভবিষ্যৎ কাজ পাওয়ার প্রশ্নে এই নির্ভরশীলতা তাঁদের প্রতিবাদ করার সুযোগ সীমিত করে। তবে কোনো প্রতিষ্ঠান কার্যাদেশ পেয়েছে কিংবা চুক্তির কোনো অংশ অন্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়েছে,এ তথ্য একাই দুর্নীতির প্রমাণ নয়। মূল কার্যাদেশ, দরপত্রের শর্ত, সাবকন্ট্রাক্টের অনুমোদন, প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত মালিকানা এবং অর্থ পরিশোধের নথি যাচাই করলেই অভিযোগের বাস্তবতা নির্ধারণ করা সম্ভব। সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে বাবুগঞ্জ ও আগৈলঝাড়ায় কারিগরি স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন প্রকল্পের প্রায় ৩২ কোটি টাকার কাজ ঘিরে কথিত কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ। ঠিকাদারদের একাংশের দাবি, বসুন্ধরা হাউজিং (প্রা.) লিমিটেডের লাইসেন্স ব্যবহার করে প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে এবং পরে ৭ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে অন্য ঠিকাদারদের কাছে কাজ হস্তান্তর করা হয়েছে। সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, প্রতিযোগিতা এবং প্রকল্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠবে। কিন্তু ৭ শতাংশ কমিশন দাবির অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে প্রকাশ করার আগে কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মালিকানা ও প্রতিনিধিত্বসংক্রান্ত তথ্য,সাবকন্ট্রাক্টের অনুমোদন, বিলের হিসাব এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা অপরিহার্য। একই প্রকল্প ঘিরে ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম বরিশালে আসার পর প্রকল্পের অগ্রিম কমিশন হিসেবে ৩৫ লাখ টাকা তাঁর দপ্তরের কম্পিউটার অপারেটর রাশেদের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগকারীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তাঁদের আরও অভিযোগ, কথিত অর্থ হস্তান্তরের পর রাশেদকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না এবং তাঁকে খুঁজতে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বরিশালে আনা ও তাঁদের ওপর চাপ প্রয়োগের ঘটনাও ঘটেছিল। তবে এই কথিত লেনদেনের পক্ষে রসিদ, ব্যাংক হিসাব, প্রত্যক্ষদর্শীর যাচাইযোগ্য সাক্ষ্য কিংবা আনুষ্ঠানিক তদন্তের নথি স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি। ফলে ৩৫ লাখ টাকা গ্রহণ, আত্মসাৎ কিংবা কোনো কর্মকর্তার সংশ্লিষ্টতা প্রমাণিত বলে দাবি করা যাচ্ছে না। এ বিষয়ে তদন্ত হলে অর্থের উৎস, হস্তান্তরের পরিস্থিতি, অর্থের পরবর্তী গতিপথ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করতে হবে। ঠিকাদারদের একাংশ আরও দাবি করেছেন, নির্বাহী প্রকৌশলীর আশপাশে ছয় থেকে আটজন ঠিকাদারকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় তৈরি হয়েছে, যারা কাজ বণ্টন, বিল ছাড় ও জামানত ফেরতের ক্ষেত্রে বাড়তি সুবিধা পেয়ে থাকেন। ঢাকায় দায়িত্ব পালন করা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সাবেক এক প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে শহিদুল ইসলামের ঘনিষ্ঠতা এবং তাঁকে নিয়মিত ইলিশ পাঠানোর অভিযোগও ঠিকাদারি মহলে আলোচিত বলে দাবি করা হয়েছে। এসব বক্তব্যের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও নথিভিত্তিক প্রমাণ প্রয়োজন। অন্যদিকে, কথিত সাংবাদিক-ঠিকাদার যোগসাজশের অভিযোগটি জনস্বার্থে আলাদা অনুসন্ধানের দাবি রাখে। অভিযোগকারীদের একাংশের ভাষ্য, কিছু সাংবাদিক নিজেদের সংবাদমাধ্যমের পরিচয়, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও দপ্তরের সঙ্গে সম্পর্ককে প্রভাব বিস্তারের উপায় হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে তাঁদের সন্দেহ। তাঁদের দাবি, দরপত্রের তথ্য, কাজ পাইয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগের কথা বলে অর্থ লেনদেনের অভিযোগও রয়েছে।

 

অভিযোগকারীরা এদের মধ্যে অতীতে ফ্যাসিবাদী রাজনৈতিক বলয়ের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত কিছু ব্যক্তির ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তবে রাজনৈতিক পরিচয়, অতীতের রাজনৈতিক যোগাযোগ কিংবা কোনো কর্মকর্তার সঙ্গে ছবি তোলা বা পরিচিতি থাকা নিজে অপরাধের প্রমাণ নয়। কে অর্থ চেয়েছেন, কার কাছ থেকে নিয়েছেন, কোন কাজের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, অর্থ কোথায় গেছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা সাংবাদিকের সঙ্গে তার প্রত্যক্ষ যোগসূত্র কী? তবে সাংবাদিক পরিচয় ব্যবহার করে যদি কেউ দরপত্রে প্রভাব বিস্তার, অবৈধ অর্থ আদায় কিংবা সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে যোগসাজশের মাধ্যমে ঠিকাদারদের কাছ থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে থাকেন, তাহলে তা অবশ্যই তদন্তের আওতায় আনা প্রয়োজন। সংবাদমাধ্যমের পরিচয় কোনো ব্যক্তিকে আইনের ঊর্ধ্বে রাখে না,একইভাবে অভিযোগ উঠলেই কাউকে অপরাধী ধরে নেওয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

বরিশাল নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প নিয়েও দরপত্র-সংক্রান্ত বিতর্কের অভিযোগ রয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা এবং ২০১৯ সালের ১৯ জুন প্রথম দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়েছিল। সে সময় কোহিনূর এন্টারপ্রাইজ কাজটি পায় বলে অভিযোগের উপাদানে উল্লেখ রয়েছে।নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ার পর পুনঃদরপত্রের বিষয়টি সামনে আসে বলে ঠিকাদারদের একাংশ জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, পরবর্তী দরপত্রে চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং প্রত্যেকেই ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে দরপত্র জমা দেয়। অভিযোগ রয়েছে, পুনঃদরপত্রে একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল এবং ওই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠতার কথাও আলোচনায় এসেছে। তবে রাজনৈতিক পরিচিতি বা সম্পর্ক দিয়ে দরপত্র কারসাজি প্রমাণ করা যায় না। দরপত্রের শর্ত, অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের যোগ্যতা, মূল্যায়ন কমিটির প্রতিবেদন, অনুমোদনের নথি এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সময়সীমা যাচাই করলেই বোঝা যাবে, নিয়ম মেনে কাজ দেওয়া হয়েছিল, নাকি প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম ঘটেছে।

 

নিরাপত্তা জামানত কর্তনের হার নিয়েও ঠিকাদারদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। তাঁদের একাংশের দাবি, কয়েকটি কাজের ক্ষেত্রে ৫ শতাংশ অর্থ কর্তন করা হয়েছে, যেখানে তাঁদের মতে ১০ শতাংশ কর্তনের কথা ছিল। কিন্তু জামানতের হার চুক্তির ধরন, দরপত্রের শর্ত ও প্রযোজ্য বিধির ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই প্রতিটি কাজের চুক্তি, প্রযোজ্য সরকারি নির্দেশনা এবং কর্তনের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। একইভাবে, কোনো ঠিকাদারের বিল আটকে থাকলে তা প্রশাসনিক জটিলতা, অসম্পূর্ণ কাজ, নথির ঘাটতি, পরিমাপের বিরোধ কিংবা অন্য কোনো কারণে হয়েছে কি না,সেটিও নথির ভিত্তিতে নির্ধারণ করতে হবে। সরকারি অর্থে নির্মিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবনের নির্মাণমান নিয়েও অভিযোগ উঠেছে প্রতিবেদনের উপাদানে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অর্ধসমাপ্ত ভবন, নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে অসন্তোষ, ছাদ থেকে পানি পড়া এবং দেয়ালে ফাটলের কথা উল্লেখ রয়েছে। একজন শিক্ষকের বক্তব্য হিসেবে ভবনের ছাদ থেকে পানি পড়া ও দেয়ালে ফাটলের অভিযোগ সামনে এসেছে। অভিযোগগুলো সত্য হলে তা শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিয়ে উদ্বেগ তৈরি করবে। তবে কোন ভবনে কী ধরনের ত্রুটি রয়েছে, কাজটি কোন ঠিকাদার করেছেন, প্রকল্পের ব্যয় কত এবং প্রকৌশলগত পরীক্ষায় কী পাওয়া গেছে,এসব যাচাই ছাড়া নিম্নমানের নির্মাণকাজ বা ভুয়া বিলের অভিযোগকে যাচাই-বাছাই করে দেখা উচিত । সংশ্লিষ্ট ভবন সরেজমিনে পরিদর্শন, নির্মাণসামগ্রীর মান পরীক্ষা, কাজের পরিমাপ এবং পরিশোধিত বিলের সঙ্গে বাস্তব অগ্রগতির তুলনা করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে ঘিরে আলোচিত প্রশ্নফাঁসের ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক থাকার দাবিও অভিযোগকারীদের একাংশ তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্যে ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ততা, বঙ্গবন্ধু প্রকৌশলী পরিষদের শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর শাখায় সদস্যপদ এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ এসেছে। তবে এসব গুরুতর দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথি প্রতিবেদনে সংযুক্ত রয়েছে ।প্রশ্নফাঁস চক্রের সদস্য বা নিয়োগে দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত হিসেবে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে। তাই সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রতিবেদন, নিয়োগের নথি ও মামলার আনুষ্ঠানিক তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন। অভিযোগকারীদের একাংশ শহিদুল ইসলামের নামে-বেনামে জমি, ফ্ল্যাট, গাড়ি ও বিপুল সম্পদ থাকার দাবিও করেছেন এবং সম্পদের উৎস অনুসন্ধানের আহ্বান জানিয়েছেন। আইনগত এখতিয়ারের মধ্যে থেকে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ প্রয়োজন মনে করলে সম্পদের বিবরণ, জমির দলিল, কোম্পানির মালিকানা ও আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা করতে পারে। ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অযাচাইকৃত আলোচনা না বাড়িয়ে সরকারি সম্পদ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, সরকারি অর্থের অননুমোদিত ব্যয় কিংবা দাপ্তরিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মতো সুনির্দিষ্ট জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অভিযোগ থাকলে সেগুলো নথিভিত্তিকভাবে অনুসন্ধান করাই দায়িত্বশীল পন্থা। এদিকে ঠিকাদার ফারুক হোসেনকে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্যে দাবি করা হয়েছে, ঘটনাটি ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর ঘটে এবং পরদিন ৩০ নভেম্বর বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় ২০৭৬ নম্বরে একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়। জিডির প্রত্যয়িত অনুলিপি, অভিযোগকারীর বক্তব্য, ঘটনার বিবরণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর জবাব যাচাই করে বিষয়টির প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা প্রয়োজন। কারণ, জিডি করা হয়ে থাকলেও তা নিজে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ করে না; তবে অভিযোগটি আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছিল কি না, তা যাচাইয়ের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে। প্রতিবেদনের উপাদানে আরও উল্লেখ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলীর অপসারণ ও অভিযোগ তদন্তের দাবিতে ভুক্তভোগী ঠিকাদাররা শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের বরিশাল কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছেন। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ জানালেও দৃশ্যমান প্রতিকার না পাওয়ায় তাঁরা প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁরা ২৪ ঠিকাদারের অভিযোগের প্রতিটি বিষয় তদন্ত, বড় প্রকল্পের আর্থিক হিসাব পরীক্ষা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর বক্তব্য হিসেবে প্রাপ্ত তথ্যে বলা হয়েছে, দুর্নীতি ও অনিয়ম বরদাস্ত করা হবে না এবং তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তদন্ত কমিটি গঠন, বিভাগীয় অনুসন্ধান, অডিট কিংবা অভিযোগের ভিত্তিতে গৃহীত প্রশাসনিক পদক্ষেপের বর্তমান অবস্থা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। তাই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে তদন্তের অগ্রগতি ও সিদ্ধান্ত জনসমক্ষে প্রকাশের দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলাম, নাম উল্লেখ করা চার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান, সংশ্লিষ্ট কম্পিউটার অপারেটর, অভিযোগে উল্লিখিত সাংবাদিক এবং প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। অভিযোগগুলোর জবাব দেওয়ার সুযোগ দেওয়া এবং প্রাপ্ত বক্তব্য যথাযথভাবে প্রকাশ করাও ন্যায়সংগত প্রতিবেদনের অংশ। সব মিলিয়ে বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল ব্যক্তি বা দপ্তরকেন্দ্রিক বিতর্ক নয়, এগুলোর সঙ্গে সরকারি অর্থের সঠিক ব্যবহার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নির্মাণমান, ঠিকাদারি প্রতিযোগিতার স্বচ্ছতা এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার প্রশ্নও জড়িত। এখন প্রয়োজন ২৪ ঠিকাদারের লিখিত অভিযোগ যাচাই, প্রায় ৩২ কোটি টাকার টিএসসি প্রকল্পের কার্যাদেশ ও আর্থিক লেনদেন পরীক্ষা, কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পুনঃদরপত্রের নথি পর্যালোচনা, নিরাপত্তা জামানত কর্তনের হার যাচাই, কথিত ৩৫ লাখ টাকা লেনদেনের প্রমাণ অনুসন্ধান, ভবনগুলোর নির্মাণমান পরীক্ষা এবং অভিযোগে উল্লিখিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও সাংবাদিকদের ভূমিকা সম্পর্কে নিরপেক্ষ অনুসন্ধান। দুর্নীতি দমন কমিশন, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগকারীদের দাবি,অভিযোগগুলো গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করে তদন্তের ফল প্রকাশ করা হোক। অভিযোগ প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে, আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ওঠা দাবিরও যথাযথ নিষ্পত্তি হওয়া দরকার। সরকারি দপ্তর কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত বলয় নয়, সরকারি প্রকল্পের অর্থও কারও কথিত কমিশন আদায়ের হাতিয়ার হতে পারে না। একইভাবে, সাংবাদিক পরিচয় বা রাজনৈতিক যোগাযোগ ব্যবহার করে কেউ যদি সরকারি কাজের প্রক্রিয়ায় অবৈধ প্রভাব বিস্তার করে থাকেন, সেটিও তদন্তের বাইরে থাকা উচিত নয়। বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর ঘিরে এখন জনস্বার্থের মূল প্রশ্ন,২৪ ঠিকাদারের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হবে কি, প্রায় ৩২ কোটি টাকার প্রকল্পের হিসাব খতিয়ে দেখা হবে কি, কথিত কমিশন ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের প্রমাণ অনুসন্ধান করা হবে কি, এবং সাংবাদিক-ঠিকাদারদের কথিত প্রভাববলয়ের বিষয়ে সত্য উদ্‌ঘাটন করা হবে কি? নাকি এসব প্রশ্নের উত্তরও ফাইলের স্তূপে চাপা পড়ে থাকবে? আজাদ বানীতে পরবর্তী অনুসন্ধানে দরপত্র, কার্যাদেশ, বিল, নিরাপত্তা জামানত, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং অভিযোগ-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে পাওয়া তথ্য তুলে ধরার পরিকল্পনা রয়েছে। কারণ অভিযোগের ভাষা যতই ঝাঁঝালো হোক, শেষ পর্যন্ত সত্য প্রতিষ্ঠা করতে হবে নথি, প্রমাণ, জবাব ও নিরপেক্ষ তদন্তের ভিত্তিতেই।