হাজিরা খাতায় ‘ইস্তফা’, ক্লাস রুটিনে নেই নাম,তবু ফেরার চেষ্টা কেন? নিয়োগের বৈধতা নিয়েও তদন্ত প্রতিবেদনে গুরুতর প্রশ্ন।

 

 

নিজস্ব প্রতিবেদক।। ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার এওয়াজপুর অজুফিয়া আলিম মাদ্রাসাকে ঘিরে নতুন করে বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। চাকরি থেকে পদত্যাগের আবেদন, শিক্ষক হাজিরা খাতায় নামের পাশে ‘ইস্তফা’ লেখা এবং ক্লাস রুটিন থেকে নাম বাদ পড়ার পরও মাদ্রাসার সহ-সুপার মো. ইকবাল হোসেনের পুনরায় প্রতিষ্ঠানে ফেরার চেষ্টা ও সরকারি বেতন-ভাতা উত্তোলনের জন্য তদবির করার অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে তার নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রকাশিত তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের তথ্য উঠে আসায় বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে আরও গুরুতর প্রশ্ন।প্রাপ্ত তথ্য, মাদ্রাসার প্রশাসনিক নথিপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য পর্যালোচনায় প্রশ্ন উঠেছে,পদত্যাগের আবেদন গৃহীত হওয়ার পর তার চাকরির বর্তমান অবস্থান কী? এমপিওভুক্ত তালিকা থেকে নাম কর্তনের আবেদন পাঠানো হয়ে থাকলে পুনরায় বেতন-ভাতা অনুমোদনের চেষ্টা কোন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে? আর নিয়োগসংক্রান্ত তদন্ত প্রতিবেদনে অনিয়মের তথ্য উঠে আসার পরও বিষয়টির চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছে কি না?

 

হাজিরা খাতায় ‘ইস্তফা’, ক্লাস রুটিনেও অনুপস্থিত!

 

মাদ্রাসার নথিপত্র সূত্রে জানা যায়, শারীরিক অসুস্থতার কারণ দেখিয়ে মো. ইকবাল হোসেন ২০২৫ সালের ৩১ আগস্ট চাকরি থেকে অব্যাহতির আবেদন করেন।পরবর্তী সময়ে মাদ্রাসার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ মো. শাহজাহান ও সভাপতি মোহাম্মদ শরীফ হোসেনের স্বাক্ষরে তার ইনডেক্স বাতিলের আবেদন মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠানো হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

 

অভিযোগের পক্ষে উপস্থাপিত নথিপত্র অনুযায়ী, পদত্যাগের আবেদন ও ইনডেক্স বাতিলের প্রক্রিয়া শুরুর পর থেকে তিনি প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত একাডেমিক কার্যক্রমে অংশ নেননি। শিক্ষকদের হাজিরা খাতায় তার নামের পাশে ‘ইস্তফা’ লেখা রয়েছে। পরবর্তী সময়ের ক্লাস রুটিনেও তার নাম দেখা যায়নি।
মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষক (আরবি) মো. হেলাল উদ্দিন বলেন,সহ-সুপার পদত্যাগ করার পর থেকে আমাদের হাজিরা খাতায় তার নামের স্থানে ‘ইস্তফা’ লেখা রয়েছে। একই সঙ্গে ক্লাস রুটিনেও তার কোনো নাম নেই।এ অবস্থায় তার চাকরির বর্তমান প্রশাসনিক অবস্থান, পদত্যাগের কার্যকারিতা এবং এমপিও-সংক্রান্ত রেকর্ড যাচাই না করে বেতন-ভাতা অনুমোদনের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে।

 

ঘটনার সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, পদত্যাগের আবেদন এবং ইনডেক্স বাতিলের প্রক্রিয়া চলার পরও ইকবাল হোসেনের বেতন অনুমোদনের জন্য একটি পক্ষ তদবির করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।উপজেলা প্রশাসনের একটি সূত্রের দাবি, ওই সহ-সুপারের বেতন অনুমোদন করানোর জন্য একটি পক্ষ জোর তদবির চালাচ্ছে। তবে প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার বেতন অনুমোদন হয়নি বলে সূত্রটি জানিয়েছে।এখানে কয়েকটি বিষয়ের স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন। তিনি যদি কার্যকরভাবে চাকরি থেকে অব্যাহতি নিয়ে থাকেন, তাহলে তার বেতন-ভাতার দাবির প্রশাসনিক ভিত্তি কী? আবার যদি তিনি দাবি করেন যে পদত্যাগটি জোরপূর্বক নেওয়া হয়েছে, তাহলে সেই অভিযোগের নিষ্পত্তি কোন পর্যায়ে রয়েছে? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি যাচাই ছাড়া এসব প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর দেওয়া সম্ভব নয়।

 

তবে একটি বিষয় স্পষ্ট,চাকরির বৈধ অবস্থান ও দায়িত্ব পালনের তথ্য যাচাই না করে সরকারি অর্থ ছাড়ের প্রশ্নে কোনো ধরনের অস্পষ্টতা থাকা উচিত নয়। একইভাবে, প্রাপ্য পাওনা থাকলে তা যেন যথাযথ বিধি অনুসারে নিষ্পত্তি হয়, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

 

তদন্ত চলাকালে অভিযুক্ত সহ-সুপারকে নিয়োগসংক্রান্ত মূল নথিপত্রসহ হাজির হতে বলা হলেও তিনি তা দেখাতে ব্যর্থ হন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।একই সঙ্গে মাদ্রাসার কার্যালয়ে সংরক্ষিত সংশ্লিষ্ট নথিপত্রেও তার নিয়োগের প্রয়োজনীয় মূল কাগজপত্র পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

যদি তদন্ত প্রতিবেদনের এসব তথ্য যথাযথ নথিপত্রের মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, তাহলে বিষয়টি কেবল প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকবে না,নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দায়বদ্ধতা এবং সরকারি অর্থের যথার্থ ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন উঠবে।তবে তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ বা অনিয়মের তথ্য উঠে আসা মানেই চূড়ান্তভাবে অপরাধ প্রমাণিত হওয়া নয়। এ ক্ষেত্রে মূল তদন্ত প্রতিবেদন, নিয়োগ বোর্ডের কার্যবিবরণী, স্বাক্ষরের সত্যতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত যাচাই করা জরুরি।

 

 

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মো. ইকবাল হোসেন বলেন, তিনি নিজের ইচ্ছায় পদত্যাগ করেননি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, অসুস্থ থাকা অবস্থায় প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও দাতা সদস্য ছালাম জমাদার তাকে জোরপূর্বক পদত্যাগে বাধ্য করেছেন।তার এই বক্তব্য অভিযোগের বিষয়টিকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। কারণ, পদত্যাগ স্বেচ্ছায় করা হয়েছিল, নাকি চাপ প্রয়োগ করে নেওয়া হয়েছিল,তার ওপর চাকরির বর্তমান অবস্থা ও পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপের বৈধতা নির্ভর করতে পারে।এ অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে পদত্যাগপত্রের মূল কপি, আবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া, ব্যবস্থাপনা কমিটির সভার কার্যবিবরণী এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন।

 

জোরপূর্বক পদত্যাগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন মাদ্রাসার সদ্য বিলুপ্ত কমিটির সভাপতি অধ্যক্ষ মীর শরীফ হোসেন। তিনি বলেন, সহ-সুপার মোহাম্মদ ইকবাল হোসেন নিজেই পদত্যাগ করেছেন।তার পদত্যাগের আবেদন ব্যবস্থাপনা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছিল। পাশাপাশি এমপিওভুক্ত তালিকা থেকে তার নাম কর্তনের জন্য যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন পাঠানো হয়েছে।সভাপতির বক্তব্য এবং ইকবাল হোসেনের দাবির মধ্যে স্পষ্ট বিরোধ রয়েছে। ফলে মৌখিক বক্তব্যের বাইরে গিয়ে পদত্যাগপত্র, সভার রেজুলেশন, ইনডেক্স বাতিলের আবেদনের গ্রহণ-সংক্রান্ত তথ্য এবং মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের সিদ্ধান্ত যাচাই করেই প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ করা সম্ভব।

 

প্রশাসনের নীরবতা, বাড়ছে প্রশ্ন!

 

এ বিষয়ে বক্তব্য নেওয়ার জন্য চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুমানা আফরোজকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। ফলে এ বিষয়ে উপজেলা প্রশাসনের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

 

তাদের দাবি, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের উচিত নিয়োগের মূল নথিপত্র, ব্যবস্থাপনা কমিটির রেজুলেশন, হাজিরা খাতা, ক্লাস রুটিন, এমপিও রেকর্ড এবং পদত্যাগ-সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা প্রকাশ করা। পাশাপাশি কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং কারও বৈধ পাওনা থাকলে তা আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।

 

এওয়াজপুর অজুফিয়া আলিম মাদ্রাসাকে ঘিরে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি শুধু একজন সহ-সুপারের চাকরির অবস্থান নির্ধারণের বিষয় নয়; এটি একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনার জবাবদিহির প্রশ্নও।হাজিরা খাতায় ‘ইস্তফা’, ক্লাস রুটিনে নাম নেই, নিয়োগের নথিপত্র নিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনে প্রশ্ন,এরপরও বেতন অনুমোদনের তদবিরের অভিযোগ কেন উঠছে? এর উত্তর অনুমান বা পাল্টাপাল্টি বক্তব্যে নয়, বরং মূল নথি যাচাই ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমেই বেরিয়ে আসা উচিত।