রোগীর কল্যাণ, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা এবং ক্যানসার আক্রান্ত অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে জাকাত ও অনুদান সংগ্রহ করে আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির কাছ থেকেও প্রতিবছর আসে বড় অঙ্কের অর্থ।
কিন্তু সেই অর্থের ব্যবহার নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
অভিযোগ উঠেছে,রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহারের কথা থাকা জাকাত ও অনুদানের অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে এফডিআর করে রাখা, সেই অর্থ থেকে মুনাফা নেওয়া এবং মিশনের অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অর্থ ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে হাসপাতালের রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে এমন চিকিৎসা ব্যয়, যা অনেক ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি।ফলে প্রশ্ন উঠছে,মানুষ যে অর্থ দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার জন্য দান করছেন, সেই অর্থের প্রকৃত সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে রোগীর কাছে?
বছরে শত কোটি টাকার চিকিৎসা ব্যবসা, কিন্তু জাকাত-অনুদানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন।
আহছানিয়া মিশন ক্যানসার ডিটেকশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার হিসেবে ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে এটি আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে রূপ নেয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে এককালীন ৭৪ কোটি টাকা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৩৯ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া প্রতিবছর জাকাত, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদান এবং সরকারি সহায়তা মিলিয়ে আসে কোটি কোটি টাকা।
হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালের সামগ্রিক মাসিক আয় প্রায় ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে—যা বছরে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার সমপরিমাণ।তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদকের কাছে মাসিক সেবা-আয়ের নির্দিষ্ট পরিমাণ জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।
জাকাতের টাকা কোথায় যাচ্ছে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে জাকাতের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে।হাসপাতালের সাবেক এক কর্মকর্তার অভিযোগ, রোগীদের চিকিৎসার জন্য আসা জাকাতের অর্থের একটি অংশ আহছানিয়া মিশনের ব্যাংক হিসাবে এফডিআর করে রাখা হয়েছে। তার দাবি, প্রায় ৮ কোটি টাকা এভাবে এফডিআর করা হয়েছিল এবং এর বিপরীতে ব্যাংক থেকে মুনাফা পাওয়া হচ্ছে।অভিযোগকারী সাবেক কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, হাসপাতালের অর্থ ব্যবহার করে রাজধানীর বসুন্ধরা শপিংমলে ‘নগরদোলা’ নামে একটি ফ্যাশন হাউস গড়ে তোলা হয়েছে।তবে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন আহছানিয়া মিশনের কোষাধ্যক্ষ ড. এম এ জলিল।
তার দাবি, জাকাতের টাকা সরানোর অভিযোগ সত্য নয়। এফডিআর করা অর্থ থাকলেও সেটি অনুদানের অর্থ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফ্যাশন হাউস ও হজ এজেন্সি থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও হাসপাতালের অর্থ দিয়ে সেগুলো করা হয়েছে,এ দাবি তিনি নাকচ করেছেন।
অর্থাৎ, অভিযোগ বনাম কর্তৃপক্ষের বক্তব্য,দুই পক্ষের বক্তব্যই এখন সামনে। প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাব ও স্বাধীন যাচাই।
চ্যারিটি হাসপাতাল, কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় কতটা চ্যারিটেবল?
হাসপাতালটি দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য অনুদান ও জাকাত গ্রহণ করলেও চিকিৎসা ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে রোগীদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ।প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন রোগীর মাত্র তিন দিনের রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। শয্যা ভাড়া, চিকিৎসক ফি, খাবার ও অন্যান্য ব্যয়সহ পাঁচ দিনে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
এখানেই প্রশ্ন,জাকাত ও অনুদানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে একজন অসহায় রোগীর চিকিৎসা যদি সাধারণ বেসরকারি হাসপাতালের মতোই ব্যয়বহুল হয়, তাহলে অনুদানের অর্থের সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে কতটা?
টেস্টের দামেও বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে পাল্লা?
প্রতিবেদনে হাসপাতালের বিভিন্ন পরীক্ষার যে মূল্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতেও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।লিপিড প্রোফাইল-১,২০০ টাকা, ব্রেইনের সিটি স্ক্যান-৫,০০০ টাকা,এস আয়রন প্রোফাইল-৩,০০০ টাকা,ট্রপোনিন আই-১,২০০ টাকা,চেস্ট সিটি স্ক্যান-৬,০০০ টাকা,চেস্ট এমআরআই-৭,০০০ টাকা।
প্রতিবেদনটির দাবি, এসব মূল্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দামের কাছাকাছি।হাসপাতালের পরিচালক অবশ্য জানিয়েছেন, অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় তারা কম খরচে চিকিৎসা দেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের সহায়তাও করা হয়।তবে উচ্চমূল্যের পরীক্ষার অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
কম দামে কেনা ওষুধ কি রোগীর কাছে বেশি দামে বিক্রি?
প্রতিবেদনে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ এসেছে ওষুধ বিক্রি নিয়ে।একটি অ্যান্টিবায়োটিকের ট্রেড প্রাইস ৭০০ টাকা হলেও রোগীর কাছে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১,২৩৫ টাকায় বিক্রির অভিযোগ করা হয়েছে।আরেকটি অ্যান্টিবায়োটিক ৭০০ টাকায় কেনা হলেও রোগীর কাছে ১,২৮৩ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে।যদি কোনো কোম্পানি চ্যারিটেবল হাসপাতালের রোগীদের জন্য বিশেষ মূল্য নির্ধারণ করে থাকে, তাহলে সেই সুবিধা রোগী পাচ্ছেন কি না,এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করার কথা জানিয়েছে।
আইসিইউতে ভেন্টিলেটর বিকল-সংকটাপন্ন রোগীদের ফেরত যাওয়ার অভিযোগ
৩৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে রয়েছে ১৫টি আইসিইউ শয্যা। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বেশ কয়েকটি ভেন্টিলেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল।হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনটি ভেন্টিলেটর নষ্ট রয়েছে এবং এ কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটর না থাকলে রোগী ভর্তি করে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়।এখানে প্রশ্নটি সরাসরি জীবন-মৃত্যুর,যে প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষ চিকিৎসার আশায় আসেন, সেখানে জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন বিকল থাকলে তার দায় কার?
ক্যানসার রোগীদের রেডিওথেরাপিতে দীর্ঘ অপেক্ষা
ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রেডিওথেরাপি। কিন্তু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আহছানিয়া হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে অনেক রোগীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
হাসপাতালে চারটি রেডিওথেরাপি মেশিন থাকার কথা জানানো হলেও কয়েকটি পুরোনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।রেডিওলজি বিভাগের একজন চিকিৎসকের মতে, রোগীর তুলনায় মেশিনের সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অনেকেই সিরিয়াল পাচ্ছেন না।অথচ ক্যানসার চিকিৎসায় সময়ই অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
নার্সিং সেবার মান নিয়েও অভিযোগ
হাসপাতালটিতে দুই শতাধিক নার্স কর্মরত থাকলেও তাদের একটি অংশের দক্ষতা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।বিশেষ করে ক্যানুলা দেওয়ার মতো মৌলিক চিকিৎসা কার্যক্রমে ভুলের অভিযোগও এসেছে।তবে হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, নতুন করে দক্ষ নার্স নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিষয়টি উন্নত করার চেষ্টা চলছে।
তাহলে জাকাত-অনুদানের অর্থের উদ্দেশ্য কী?
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অর্থের পরিমাণ নয়,অর্থের উদ্দেশ্য।মানুষ যখন ক্যানসার আক্রান্ত দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার জন্য জাকাত দেন, তখন সেই অর্থের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রোগীর চিকিৎসা সহায়তা।সেই অর্থ যদি দীর্ঘদিন ব্যাংকে পড়ে থাকে, কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে দাতাদের জানার অধিকার রয়েছে,কত টাকা জাকাত হিসেবে সংগ্রহ হয়েছে?কত টাকা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে?কত টাকা এফডিআরে রাখা হয়েছে?
এফডিআর থেকে কত মুনাফা এসেছে?
হাসপাতালের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে কি না?দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে?অনুদানের অর্থের বার্ষিক অডিট রিপোর্ট কোথায়?
তদন্তের দাবি, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বচ্ছতা!
আহছানিয়া মিশন একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।তবে অভিযোগগুলো যেহেতু জাকাত, অনুদান, রোগীর চিকিৎসা ব্যয়, হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম,এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাই বিষয়টি শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজন স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রয়োজনে স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
কারণ প্রশ্ন একটাই,মানুষের দান করা টাকা কি মানুষের চিকিৎসাতেই খরচ হচ্ছে, নাকি সেই অর্থের আড়ালে তৈরি হচ্ছে অন্য কোনো ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য?
নিজস্ব প্রতিবেদক।।রোগীর কল্যাণ, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা এবং ক্যানসার আক্রান্ত অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে জাকাত ও অনুদান সংগ্রহ করে আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির কাছ থেকেও প্রতিবছর আসে বড় অঙ্কের অর্থ।
কিন্তু সেই অর্থের ব্যবহার নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
অভিযোগ উঠেছে,রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহারের কথা থাকা জাকাত ও অনুদানের অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে এফডিআর করে রাখা, সেই অর্থ থেকে মুনাফা নেওয়া এবং মিশনের অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অর্থ ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে হাসপাতালের রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে এমন চিকিৎসা ব্যয়, যা অনেক ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি।ফলে প্রশ্ন উঠছে,মানুষ যে অর্থ দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার জন্য দান করছেন, সেই অর্থের প্রকৃত সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে রোগীর কাছে?
বছরে শত কোটি টাকার চিকিৎসা ব্যবসা, কিন্তু জাকাত-অনুদানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন।
আহছানিয়া মিশন ক্যানসার ডিটেকশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার হিসেবে ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে এটি আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে রূপ নেয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে এককালীন ৭৪ কোটি টাকা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৩৯ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া প্রতিবছর জাকাত, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদান এবং সরকারি সহায়তা মিলিয়ে আসে কোটি কোটি টাকা।
হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালের সামগ্রিক মাসিক আয় প্রায় ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে,যা বছরে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার সমপরিমাণ।তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদকের কাছে মাসিক সেবা-আয়ের নির্দিষ্ট পরিমাণ জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।
জাকাতের টাকা কোথায় যাচ্ছে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে জাকাতের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে।হাসপাতালের সাবেক এক কর্মকর্তার অভিযোগ, রোগীদের চিকিৎসার জন্য আসা জাকাতের অর্থের একটি অংশ আহছানিয়া মিশনের ব্যাংক হিসাবে এফডিআর করে রাখা হয়েছে। তার দাবি, প্রায় ৮ কোটি টাকা এভাবে এফডিআর করা হয়েছিল এবং এর বিপরীতে ব্যাংক থেকে মুনাফা পাওয়া হচ্ছে।অভিযোগকারী সাবেক কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, হাসপাতালের অর্থ ব্যবহার করে রাজধানীর বসুন্ধরা শপিংমলে ‘নগরদোলা’ নামে একটি ফ্যাশন হাউস গড়ে তোলা হয়েছে।তবে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন আহছানিয়া মিশনের কোষাধ্যক্ষ ড. এম এ জলিল।
তার দাবি, জাকাতের টাকা সরানোর অভিযোগ সত্য নয়। এফডিআর করা অর্থ থাকলেও সেটি অনুদানের অর্থ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফ্যাশন হাউস ও হজ এজেন্সি থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও হাসপাতালের অর্থ দিয়ে সেগুলো করা হয়েছে,এ দাবি তিনি নাকচ করেছেন।
অর্থাৎ, অভিযোগ বনাম কর্তৃপক্ষের বক্তব্য,দুই পক্ষের বক্তব্যই এখন সামনে। প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাব ও স্বাধীন যাচাই।
চ্যারিটি হাসপাতাল, কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় কতটা চ্যারিটেবল?
হাসপাতালটি দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য অনুদান ও জাকাত গ্রহণ করলেও চিকিৎসা ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে রোগীদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ।প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন রোগীর মাত্র তিন দিনের রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। শয্যা ভাড়া, চিকিৎসক ফি, খাবার ও অন্যান্য ব্যয়সহ পাঁচ দিনে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
এখানেই প্রশ্ন,জাকাত ও অনুদানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে একজন অসহায় রোগীর চিকিৎসা যদি সাধারণ বেসরকারি হাসপাতালের মতোই ব্যয়বহুল হয়, তাহলে অনুদানের অর্থের সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে কতটা?
টেস্টের দামেও বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে পাল্লা?
প্রতিবেদনে হাসপাতালের বিভিন্ন পরীক্ষার যে মূল্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতেও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।লিপিড প্রোফাইল-১,২০০ টাকা, ব্রেইনের সিটি স্ক্যান-৫,০০০ টাকা,এস আয়রন প্রোফাইল-৩,০০০ টাকা,ট্রপোনিন আই-১,২০০ টাকা,চেস্ট সিটি স্ক্যান-৬,০০০ টাকা,চেস্ট এমআরআই-৭,০০০ টাকা।
প্রতিবেদনটির দাবি, এসব মূল্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দামের কাছাকাছি।হাসপাতালের পরিচালক অবশ্য জানিয়েছেন, অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় তারা কম খরচে চিকিৎসা দেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের সহায়তাও করা হয়।তবে উচ্চমূল্যের পরীক্ষার অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
কম দামে কেনা ওষুধ কি রোগীর কাছে বেশি দামে বিক্রি?
প্রতিবেদনে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ এসেছে ওষুধ বিক্রি নিয়ে।একটি অ্যান্টিবায়োটিকের ট্রেড প্রাইস ৭০০ টাকা হলেও রোগীর কাছে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১,২৩৫ টাকায় বিক্রির অভিযোগ করা হয়েছে।আরেকটি অ্যান্টিবায়োটিক ৭০০ টাকায় কেনা হলেও রোগীর কাছে ১,২৮৩ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে।যদি কোনো কোম্পানি চ্যারিটেবল হাসপাতালের রোগীদের জন্য বিশেষ মূল্য নির্ধারণ করে থাকে, তাহলে সেই সুবিধা রোগী পাচ্ছেন কি না,এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করার কথা জানিয়েছে।
আইসিইউতে ভেন্টিলেটর বিকল-সংকটাপন্ন রোগীদের ফেরত যাওয়ার অভিযোগ
৩৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে রয়েছে ১৫টি আইসিইউ শয্যা। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বেশ কয়েকটি ভেন্টিলেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল।হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনটি ভেন্টিলেটর নষ্ট রয়েছে এবং এ কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটর না থাকলে রোগী ভর্তি করে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়।এখানে প্রশ্নটি সরাসরি জীবন-মৃত্যুর,যে প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষ চিকিৎসার আশায় আসেন, সেখানে জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন বিকল থাকলে তার দায় কার?
ক্যানসার রোগীদের রেডিওথেরাপিতে দীর্ঘ অপেক্ষা
ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রেডিওথেরাপি। কিন্তু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আহছানিয়া হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে অনেক রোগীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
হাসপাতালে চারটি রেডিওথেরাপি মেশিন থাকার কথা জানানো হলেও কয়েকটি পুরোনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।রেডিওলজি বিভাগের একজন চিকিৎসকের মতে, রোগীর তুলনায় মেশিনের সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অনেকেই সিরিয়াল পাচ্ছেন না।অথচ ক্যানসার চিকিৎসায় সময়ই অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
নার্সিং সেবার মান নিয়েও অভিযোগ
হাসপাতালটিতে দুই শতাধিক নার্স কর্মরত থাকলেও তাদের একটি অংশের দক্ষতা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।বিশেষ করে ক্যানুলা দেওয়ার মতো মৌলিক চিকিৎসা কার্যক্রমে ভুলের অভিযোগও এসেছে।তবে হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, নতুন করে দক্ষ নার্স নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিষয়টি উন্নত করার চেষ্টা চলছে।
তাহলে জাকাত-অনুদানের অর্থের উদ্দেশ্য কী?
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অর্থের পরিমাণ নয়,অর্থের উদ্দেশ্য।মানুষ যখন ক্যানসার আক্রান্ত দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার জন্য জাকাত দেন, তখন সেই অর্থের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রোগীর চিকিৎসা সহায়তা।সেই অর্থ যদি দীর্ঘদিন ব্যাংকে পড়ে থাকে, কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে দাতাদের জানার অধিকার রয়েছে,কত টাকা জাকাত হিসেবে সংগ্রহ হয়েছে?কত টাকা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে?কত টাকা এফডিআরে রাখা হয়েছে?
এফডিআর থেকে কত মুনাফা এসেছে?
হাসপাতালের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে কি না?দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে?অনুদানের অর্থের বার্ষিক অডিট রিপোর্ট কোথায়?
তদন্তের দাবি, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বচ্ছতা!
আহছানিয়া মিশন একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।তবে অভিযোগগুলো যেহেতু জাকাত, অনুদান, রোগীর চিকিৎসা ব্যয়, হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম,এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাই বিষয়টি শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজন স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রয়োজনে স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
কারণ প্রশ্ন একটাই,মানুষের দান করা টাকা কি মানুষের চিকিৎসাতেই খরচ হচ্ছে, নাকি সেই অর্থের আড়ালে তৈরি হচ্ছে অন্য কোনো ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য?
নিজস্ব প্রতিবেদক।।রোগীর কল্যাণ, দরিদ্র মানুষের চিকিৎসা এবং ক্যানসার আক্রান্ত অসহায় রোগীদের পাশে দাঁড়ানোর প্রত্যয় নিয়ে জাকাত ও অনুদান সংগ্রহ করে আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতাল। সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন সংস্থা ও ব্যক্তির কাছ থেকেও প্রতিবছর আসে বড় অঙ্কের অর্থ।
কিন্তু সেই অর্থের ব্যবহার নিয়ে উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন।
অভিযোগ উঠেছে,রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহারের কথা থাকা জাকাত ও অনুদানের অর্থের একটি অংশ ব্যাংকে এফডিআর করে রাখা, সেই অর্থ থেকে মুনাফা নেওয়া এবং মিশনের অন্যান্য ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অর্থ ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। একই সময়ে হাসপাতালের রোগীদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে এমন চিকিৎসা ব্যয়, যা অনেক ক্ষেত্রে দেশের শীর্ষ বেসরকারি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক প্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি।ফলে প্রশ্ন উঠছে,মানুষ যে অর্থ দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার জন্য দান করছেন, সেই অর্থের প্রকৃত সুফল কতটা পৌঁছাচ্ছে রোগীর কাছে?
বছরে শত কোটি টাকার চিকিৎসা ব্যবসা, কিন্তু জাকাত-অনুদানের ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন।
আহছানিয়া মিশন ক্যানসার ডিটেকশন অ্যান্ড ট্রিটমেন্ট সেন্টার হিসেবে ২০০১ সালে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ২০১৪ সালে এটি আহছানিয়া মিশন ক্যানসার অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে রূপ নেয়।প্রতিবেদন অনুযায়ী, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে প্রতিষ্ঠানটিকে এককালীন ৭৪ কোটি টাকা এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৩৯ কোটি টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছিল।
এ ছাড়া প্রতিবছর জাকাত, বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের অনুদান এবং সরকারি সহায়তা মিলিয়ে আসে কোটি কোটি টাকা।
হাসপাতালের সাবেক পরিচালক ও ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের বক্তব্য অনুযায়ী, হাসপাতালের সামগ্রিক মাসিক আয় প্রায় ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত হতে পারে—যা বছরে প্রায় ৩৬০ কোটি টাকার সমপরিমাণ।তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রতিবেদকের কাছে মাসিক সেবা-আয়ের নির্দিষ্ট পরিমাণ জানাতে অপারগতা প্রকাশ করেছে।
জাকাতের টাকা কোথায় যাচ্ছে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে জাকাতের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে।হাসপাতালের সাবেক এক কর্মকর্তার অভিযোগ, রোগীদের চিকিৎসার জন্য আসা জাকাতের অর্থের একটি অংশ আহছানিয়া মিশনের ব্যাংক হিসাবে এফডিআর করে রাখা হয়েছে। তার দাবি, প্রায় ৮ কোটি টাকা এভাবে এফডিআর করা হয়েছিল এবং এর বিপরীতে ব্যাংক থেকে মুনাফা পাওয়া হচ্ছে।অভিযোগকারী সাবেক কর্মকর্তা আরও দাবি করেন, হাসপাতালের অর্থ ব্যবহার করে রাজধানীর বসুন্ধরা শপিংমলে ‘নগরদোলা’ নামে একটি ফ্যাশন হাউস গড়ে তোলা হয়েছে।তবে এই অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছেন আহছানিয়া মিশনের কোষাধ্যক্ষ ড. এম এ জলিল।
তার দাবি, জাকাতের টাকা সরানোর অভিযোগ সত্য নয়। এফডিআর করা অর্থ থাকলেও সেটি অনুদানের অর্থ হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন। ফ্যাশন হাউস ও হজ এজেন্সি থাকার বিষয়টি স্বীকার করলেও হাসপাতালের অর্থ দিয়ে সেগুলো করা হয়েছে,এ দাবি তিনি নাকচ করেছেন।
অর্থাৎ, অভিযোগ বনাম কর্তৃপক্ষের বক্তব্য,দুই পক্ষের বক্তব্যই এখন সামনে। প্রয়োজন স্বচ্ছ হিসাব ও স্বাধীন যাচাই।
চ্যারিটি হাসপাতাল, কিন্তু চিকিৎসা ব্যয় কতটা চ্যারিটেবল?
হাসপাতালটি দরিদ্র ও অসহায় রোগীদের চিকিৎসার জন্য অনুদান ও জাকাত গ্রহণ করলেও চিকিৎসা ব্যয়ের কাঠামো নিয়ে রোগীদের মধ্যে রয়েছে অসন্তোষ।প্রতিবেদন অনুযায়ী, একজন রোগীর মাত্র তিন দিনের রোগ নির্ণয় পরীক্ষায় প্রায় ৩০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। শয্যা ভাড়া, চিকিৎসক ফি, খাবার ও অন্যান্য ব্যয়সহ পাঁচ দিনে খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা।
এখানেই প্রশ্ন,জাকাত ও অনুদানে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানে একজন অসহায় রোগীর চিকিৎসা যদি সাধারণ বেসরকারি হাসপাতালের মতোই ব্যয়বহুল হয়, তাহলে অনুদানের অর্থের সামাজিক উদ্দেশ্য পূরণ হচ্ছে কতটা?
টেস্টের দামেও বেসরকারি হাসপাতালের সঙ্গে পাল্লা?
প্রতিবেদনে হাসপাতালের বিভিন্ন পরীক্ষার যে মূল্য তুলে ধরা হয়েছে, তাতেও তৈরি হয়েছে বিতর্ক।লিপিড প্রোফাইল-১,২০০ টাকা, ব্রেইনের সিটি স্ক্যান-৫,০০০ টাকা,এস আয়রন প্রোফাইল-৩,০০০ টাকা,ট্রপোনিন আই-১,২০০ টাকা,চেস্ট সিটি স্ক্যান-৬,০০০ টাকা,চেস্ট এমআরআই-৭,০০০ টাকা।
প্রতিবেদনটির দাবি, এসব মূল্য অনেক ক্ষেত্রে দেশের প্রতিষ্ঠিত বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দামের কাছাকাছি।হাসপাতালের পরিচালক অবশ্য জানিয়েছেন, অন্যান্য বেসরকারি হাসপাতালের তুলনায় তারা কম খরচে চিকিৎসা দেন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রোগীদের সহায়তাও করা হয়।তবে উচ্চমূল্যের পরীক্ষার অভিযোগ খতিয়ে দেখার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।
কম দামে কেনা ওষুধ কি রোগীর কাছে বেশি দামে বিক্রি?
প্রতিবেদনে আরও গুরুতর একটি অভিযোগ এসেছে ওষুধ বিক্রি নিয়ে।একটি অ্যান্টিবায়োটিকের ট্রেড প্রাইস ৭০০ টাকা হলেও রোগীর কাছে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১,২৩৫ টাকায় বিক্রির অভিযোগ করা হয়েছে।আরেকটি অ্যান্টিবায়োটিক ৭০০ টাকায় কেনা হলেও রোগীর কাছে ১,২৮৩ টাকায় বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে।যদি কোনো কোম্পানি চ্যারিটেবল হাসপাতালের রোগীদের জন্য বিশেষ মূল্য নির্ধারণ করে থাকে, তাহলে সেই সুবিধা রোগী পাচ্ছেন কি না,এ প্রশ্নের উত্তর পাওয়া জরুরি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বিষয়টি তদন্ত করার কথা জানিয়েছে।
আইসিইউতে ভেন্টিলেটর বিকল-সংকটাপন্ন রোগীদের ফেরত যাওয়ার অভিযোগ
৩৫০ শয্যার হাসপাতালটিতে রয়েছে ১৫টি আইসিইউ শয্যা। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, বেশ কয়েকটি ভেন্টিলেটর দীর্ঘদিন ধরে বিকল।হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, বর্তমানে তিনটি ভেন্টিলেটর নষ্ট রয়েছে এবং এ কারণে সংকটাপন্ন রোগীদের ভর্তি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।তিনি বলেন, প্রয়োজনীয় ভেন্টিলেটর না থাকলে রোগী ভর্তি করে কাঙ্ক্ষিত চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব নয়।এখানে প্রশ্নটি সরাসরি জীবন-মৃত্যুর,যে প্রতিষ্ঠানের কাছে মানুষ চিকিৎসার আশায় আসেন, সেখানে জীবনরক্ষাকারী যন্ত্রপাতি দীর্ঘদিন বিকল থাকলে তার দায় কার?
ক্যানসার রোগীদের রেডিওথেরাপিতে দীর্ঘ অপেক্ষা
ক্যানসার চিকিৎসার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ রেডিওথেরাপি। কিন্তু প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, আহছানিয়া হাসপাতালে রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পেতে অনেক রোগীকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে।
হাসপাতালে চারটি রেডিওথেরাপি মেশিন থাকার কথা জানানো হলেও কয়েকটি পুরোনো ও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে উঠে এসেছে।রেডিওলজি বিভাগের একজন চিকিৎসকের মতে, রোগীর তুলনায় মেশিনের সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে প্রতিদিন বিপুল সংখ্যক রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হলেও অনেকেই সিরিয়াল পাচ্ছেন না।অথচ ক্যানসার চিকিৎসায় সময়ই অনেক ক্ষেত্রে জীবন বাঁচানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
নার্সিং সেবার মান নিয়েও অভিযোগ
হাসপাতালটিতে দুই শতাধিক নার্স কর্মরত থাকলেও তাদের একটি অংশের দক্ষতা নিয়ে অভিযোগ উঠেছে।বিশেষ করে ক্যানুলা দেওয়ার মতো মৌলিক চিকিৎসা কার্যক্রমে ভুলের অভিযোগও এসেছে।তবে হাসপাতালের পরিচালক জানিয়েছেন, নতুন করে দক্ষ নার্স নিয়োগ এবং প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বিষয়টি উন্নত করার চেষ্টা চলছে।
তাহলে জাকাত-অনুদানের অর্থের উদ্দেশ্য কী?
এই পুরো ঘটনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি অর্থের পরিমাণ নয়,অর্থের উদ্দেশ্য।মানুষ যখন ক্যানসার আক্রান্ত দরিদ্র রোগীর চিকিৎসার জন্য জাকাত দেন, তখন সেই অর্থের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত রোগীর চিকিৎসা সহায়তা।সেই অর্থ যদি দীর্ঘদিন ব্যাংকে পড়ে থাকে, কিংবা অন্য কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রমে ব্যবহারের অভিযোগ ওঠে, তাহলে দাতাদের জানার অধিকার রয়েছে,কত টাকা জাকাত হিসেবে সংগ্রহ হয়েছে?কত টাকা রোগীদের চিকিৎসায় ব্যয় হয়েছে?কত টাকা এফডিআরে রাখা হয়েছে?
এফডিআর থেকে কত মুনাফা এসেছে?
হাসপাতালের বাইরে কোনো প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগ করা হয়েছে কি না?দরিদ্র রোগীদের বিনামূল্যে চিকিৎসায় কত টাকা ব্যয় হয়েছে?অনুদানের অর্থের বার্ষিক অডিট রিপোর্ট কোথায়?
তদন্তের দাবি, প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ আর্থিক স্বচ্ছতা!
আহছানিয়া মিশন একটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান। ফলে এর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ যেমন গুরুত্বের সঙ্গে যাচাই করা প্রয়োজন, তেমনি অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।তবে অভিযোগগুলো যেহেতু জাকাত, অনুদান, রোগীর চিকিৎসা ব্যয়, হাসপাতালের আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা সরঞ্জাম,এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, তাই বিষয়টি শুধু অভ্যন্তরীণ ব্যাখ্যায় সীমাবদ্ধ না রেখে প্রয়োজন স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা এবং প্রয়োজনে স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে পুরো আর্থিক ব্যবস্থাপনা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র সামনে আসতে পারে।
কারণ প্রশ্ন একটাই,মানুষের দান করা টাকা কি মানুষের চিকিৎসাতেই খরচ হচ্ছে, নাকি সেই অর্থের আড়ালে তৈরি হচ্ছে অন্য কোনো ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য?