নিজস্ব প্রতিবেদক।।গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদকে ঘিরে আবারও আলোচনার ঝড় উঠেছে। ঘুষ, দুর্নীতি, কমিশন বাণিজ্য, ভুয়া বিল-ভাউচারের মাধ্যমে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মতো একাধিক গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও শাস্তিমূলক বদলির পর পুনরায় ঢাকায় গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পাওয়ায় সংশ্লিষ্ট মহলে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, ২৮তম বিসিএস (গণপূর্ত) ক্যাডারের এই কর্মকর্তা কর্মজীবনের বিভিন্ন সময়ে নানা অনিয়ম ও বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়লেও তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। বরং অভিযোগের পরেও তিনি পুনরায় রাজধানীতে দায়িত্ব পেয়ে প্রভাবশালী অবস্থানে ফিরে এসেছেন বলে দাবি করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, মতিঝিল গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে তিনি সরকারি ক্রয়বিধি ও প্রধান প্রকৌশলীর নির্দেশনা উপেক্ষা করে দরপত্র ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম করেন। বিশেষ করে এলটিএম (LTM) পদ্ধতির পরিবর্তে ওটিএম (OTM) পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ পাইয়ে দেওয়ার মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের কমিশন গ্রহণের অভিযোগ উঠেছে।
এছাড়া রাজনৈতিক পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে ক্ষমতাসীন দলের ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের সুবিধা দেওয়া, সরকারি আবাসনের কক্ষ অবৈধভাবে ভাড়া দেওয়া এবং বিভিন্ন মেরামত কাজ বাস্তবে সম্পন্ন না করেই ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে সরকারি অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও রয়েছে।অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন, আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ সময়ে মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে মতিঝিল এলাকার এক রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিকে প্রায় পাঁচ কোটি টাকার একটি সরকারি কাজ পাইয়ে দেওয়া হয়েছিল।
অভিযোগপত্র অনুযায়ী, বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তাকে গাইবান্ধায় বদলি করা হয়। সংশ্লিষ্টরা এটিকে কার্যত শাস্তিমূলক বদলি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।তবে অভিযোগ রয়েছে, কিছুদিনের মধ্যেই প্রভাব খাটিয়ে ও বিপুল অর্থ ব্যয় করে তিনি পুনরায় রাজধানীতে ফিরে আসেন। বর্তমানে তিনি ঢাকার আরবিকালচার গণপূর্ত বিভাগে নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমান কর্মস্থলেও তার বিরুদ্ধে নতুন করে অভিযোগ উঠেছে। বিভিন্ন প্রকল্পের ফাইল অনুমোদন, বিল পাস এবং কাজের অগ্রগতি সংক্রান্ত প্রশাসনিক কার্যক্রমে ঘুষ ও কমিশন গ্রহণের অভিযোগ করেছেন একাধিক ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি।অভিযোগকারীদের দাবি, কোনো প্রকল্পের ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি কিংবা অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে অনৈতিক আর্থিক লেনদেন ছাড়া কাজ এগোনো কঠিন হয়ে পড়ে।
অভিযোগের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো বিপুল পরিমাণ সম্পদ অর্জন। অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণভাবে তিনি রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন।সূত্রমতে, তিনি রাজধানীর ইন্দিরা রোড এলাকার ৪২/২ নম্বর ভবনের একটি অভিজাত ফ্ল্যাটে বসবাস করেন, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা বলে দাবি করা হয়েছে। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় আরও একাধিক ফ্ল্যাট ও প্লট থাকার অভিযোগ রয়েছে।নিজ জেলা নেত্রকোনার কমলাকান্দা উপজেলাতেও তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিপুল পরিমাণ জমি, স্থাপনা ও অন্যান্য সম্পদ অর্জনের অভিযোগ উঠেছে।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, তার পিতা মজিবর রহমান তালুকদার, মাতা রোকেয়া তালুকদার, স্ত্রী ইফফাত আলতাব জেনি, সন্তান এবং ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের নামে বেনামে বিভিন্ন সম্পদ ক্রয় করা হয়েছে অভিযোগকারীদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) যদি তার এবং পরিবারের সদস্যদের সম্পদের উৎস ও আয়-ব্যয়ের হিসাব অনুসন্ধান করে, তাহলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কালাম আজাদের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতে অভিযোগের বিষয়গুলো হোয়াটসঅ্যাপে লিখিতভাবে পাঠানো হলেও সংবাদ প্রকাশ পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী কর্মীরা বলছেন, গণপূর্ত অধিদপ্তরে দীর্ঘদিন ধরে দুর্নীতির যে অভিযোগগুলো সামনে আসছে, সেগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত জরুরি। বিশেষ করে যেসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বারবার একই ধরনের অভিযোগ উঠছে, তাদের সম্পদ, ব্যাংক হিসাব, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং দরপত্র কার্যক্রম খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।