প্রিন্ট এর তারিখঃ জুন ২, ২০২৬, ১১:৪৮ পি.এম || প্রকাশের তারিখঃ জুন ২, ২০২৬, ৮:৪৪ পি.এম

নিজস্ব প্রতিবেদক : বরিশালের বানারীপাড়া উপজেলার বাইশারি এলাকার সাতানি গ্রামের দত্তবাড়ি মৌজায় অবস্থিত প্রায় সাড়ে চারশ’ বছরের পুরোনো একাধিক ঐতিহাসিক স্থাপনা আজ বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে। নির্মাণশৈলীর অনন্য নিদর্শন এবং ইতিহাসের জীবন্ত সাক্ষী হিসেবে পরিচিত এই স্থানে একসময় ৪০টি স্থাপনা থাকলেও বর্তমানে টিকে আছে মাত্র ২৪টি। ইতোমধ্যে ১৬টি স্থাপনা সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। অবশিষ্ট স্থাপনাগুলোর মধ্যেও রয়েছে সতীদাহ ভিটে, জমিদার বাড়ি, বালাখানা, সরাইখানা ও বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপত্য নিদর্শন, যা এখনো দর্শনার্থীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বানারীপাড়া উপজেলার সাতানি গ্রামের দত্তবাড়ি মৌজায় অবস্থিত দুই জমিদার ভাইয়ের প্রতিষ্ঠিত এই ঐতিহাসিক ভিটা প্রায় সাড়ে চারশ’ বছর ধরে ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। একসময় এখানে নিয়মিত পূজা-পার্বণ অনুষ্ঠিত হলেও বর্তমানে বছরেও একটি পূজার আয়োজন হয় না। গাছগাছালিতে আচ্ছাদিত হয়ে পড়েছে নান্দনিক স্থাপত্যশৈলীর অনেক অংশ। সতীদাহ প্রথার স্মৃতিবিজড়িত বেদিটিও এখনো অতীতের নির্মম ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে।
জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি গোবিন্দ ভৌমিক বলেন, এখানে সতীদাহের একটি বেদি রয়েছে, যা দেখতে এখনো মানুষ আসে। জমিদার বাড়ির বিভিন্ন ভাঙাচোরা ভবন, চুন-সুরকির নির্মাণকাজ ও ধ্বংসাবশেষ এখনো অতীতের স্মৃতি বহন করছে। তিনি জানান, এলাকার অধিকাংশ মানুষ বিভিন্ন স্থানে চলে গেছেন। জমিদার পরিবারের বংশধররা বর্তমানে ভারতসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বসবাস করছেন।
একই পরিবারের আরেক উত্তরসূরি শ্যামা প্রসাদ বলেন, এটি ঈশ্বর নারায়ণ সরকারের বাড়ি, যার বয়স ২০০ বছরেরও বেশি। তিনি এই পরিবারের ষষ্ঠ প্রজন্মের সদস্য। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়ির উঠান ঘিরে ২৪টি প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে, যা একটি বিরল ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্য নিদর্শন। তবে বর্তমানে অধিকাংশ স্থাপনাই বিলুপ্তির পথে। একসময় এই বাড়িতে ২০০ জনেরও বেশি মানুষের বসবাস ছিল, এখন সেখানে মাত্র দুজন সদস্য রয়েছেন। ভবনগুলোর দেয়াল দাঁড়িয়ে থাকলেও অধিকাংশের ছাদ নেই। অর্থ ও জনবলের অভাবে সংস্কার কার্যক্রমও সম্ভব হচ্ছে না।
ইতিহাসবিদদের মতে, ইতিহাসখ্যাত বারো ভূঁইয়ার অন্যতম শাসক রাজা প্রতাপাদিত্যের দুই বংশধর সীতারাম ও বিজরাম ১৫৬০ থেকে ১৬০০ খ্রিষ্টাব্দের মধ্যে এই এলাকায় জমিদারি প্রতিষ্ঠা করেন। ধারণা করা হয়, সেই সময়েই এসব স্থাপনা নির্মিত হয়েছিল। ফলে এটি বরিশাল বিভাগের অন্যতম প্রাচীন স্থাপত্য নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত।
লেখক ও গবেষক সাইফুল আহসান বুলবুল বলেন, মোগল সাম্রাজ্যের শেষ দিকে ভারতবর্ষে যেসব স্বাধীন রাজ্য নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রেখেছিল, বারো ভূঁইয়া তাদের অন্যতম। বরিশালের এই জমিদার বাড়ির প্রতিষ্ঠাতারা ছিলেন রাজা প্রতাপাদিত্যের বংশধর সীতারাম ও বিজরাম। তিনি বলেন, এই স্থাপনাগুলো কেবল একটি বাড়ির ধ্বংসাবশেষ নয়, বরং একটি সময়, একটি ইতিহাস এবং একটি জাতির সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। এগুলো সংরক্ষণ না করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় থেকে বঞ্চিত হবে।
প্রতিদিনই নানা প্রতিকূলতা পেরিয়ে ইতিহাসপ্রেমী, গবেষক, শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা স্থানটি পরিদর্শনে আসেন। তাদের মতে, ইতোমধ্যে ১৬টি স্থাপনা হারিয়ে গেছে। তাই অবশিষ্ট ২৪টি স্থাপনা রক্ষায় দ্রুত প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও পর্যটন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।
বানারীপাড়া ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ মোসাম্মত আফরোজা বেগম বলেন, এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন। একসময় ৪০টি স্থাপনা থাকলেও বর্তমানে ২৪টি ভবনের শুধু দেয়াল টিকে আছে। তবে তাদের নির্মাণশৈলী ও কাঠামো এখনো প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অনন্য স্মারক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তিনি মনে করেন, এগুলো সংরক্ষণ করা হলে পর্যটন ও গবেষণার নতুন ক্ষেত্র সৃষ্টি হবে।
বাইশারি সৈয়দ বজলুল হক কলেজের অধ্যক্ষ সৈয়দ এনামুল হক বলেন, এই ভিটায় একসময় ৪০টি স্থাপনা ছিল, বর্তমানে রয়েছে ২৪টি। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী, গবেষক ও জ্ঞানপিপাসু মানুষ এখানে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখতে আসেন। একই স্থানে এত সংখ্যক প্রাচীন স্থাপনা অন্য কোথাও রয়েছে বলে তার জানা নেই। তিনি দ্রুত সরকারি উদ্যোগে এসব স্থাপনা সংরক্ষণের দাবি জানান।
এদিকে স্থানীয়দের মুখে বিষয়টি জানার পর সম্প্রতি প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা স্থানটি পরিদর্শন করেছেন। সংশ্লিষ্টদের আশা, বারো ভূঁইয়ার ইতিহাসের সঙ্গে জড়িত এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো সংরক্ষণে শিগগিরই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের বরিশাল বিভাগীয় জাদুঘরের সহকারী কাস্টোডিয়ান আরিফুর রহমান বলেন, সম্প্রতি তারা স্থানটি পরিদর্শন করেছেন। সেখানে একটি নয়, বরং বিভিন্ন আমলের একাধিক প্রাচীন স্থাপনা রয়েছে। বরিশাল অঞ্চলে একই স্থানে এতগুলো প্রাচীন স্থাপনার নজির নেই। প্রত্নতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি জানান, বিষয়টি আগে অধিদপ্তরকে কেউ অবহিত করেননি। পরিদর্শনের পর তিনি এ বিষয়ে একটি প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দেবেন।
উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বরিশাল বিভাগের বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, ঝালকাঠি ও পিরোজপুর জেলার মোট ২৫টি পুরাকীর্তি সংরক্ষণ করছে। এর মধ্যে লাকুটিয়া জমিদার বাড়ি, কড়াপুরের মিয়াবাড়ি মসজিদ এবং চাখারে শের-ই-বাংলা এ কে ফজলুল হকের বিশ্রামাগার উল্লেখযোগ্য। স্থানীয়দের দাবি, সাতানি গ্রামের এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলোকেও দ্রুত সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হোক।