
নিজস্ব প্রতিবেদক ।।রাজধানীর দনিয়া এলাকার আলোচিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজ এখন যেন শিক্ষা নয়, আতঙ্ক আর অভিযোগের আরেক নাম! ১০ম শ্রেণির ছাত্রী সাবিকুনের মর্মান্তিক আত্মহত্যার ঘটনায় পুরো এলাকায় শোকের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছে তীব্র ক্ষোভ, উত্তেজনা ও প্রতিবাদের ঝড়। একটি সম্ভাবনাময় কিশোরীর এমন করুণ মৃত্যু ঘিরে উঠছে ভয়াবহ সব অভিযোগ,যার কেন্দ্রে রয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক আলহাজ্ব মাসুদ রানা লিটন ও কয়েকজন শিক্ষিকা।পরিবার, সহপাঠী ও স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে চলা মানসিক চাপ, অপমান, ভয়ভীতি ও অমানবিক আচরণের শিকার ছিল সাবিকুন। গত ২০ মে দুপুর ৩টার দিকে আত্মহত্যার পথ বেছে নেয় সে। অভিযোগ উঠেছে, স্কুল কর্তৃপক্ষের লাগাতার মানসিক নির্যাতনই তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে।
একাধিক অভিভাবকের ভাষ্য অনুযায়ী, ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজে শিক্ষার পরিবেশের চেয়ে ভয়ভীতির পরিবেশই বেশি প্রকট। সামান্য ভুলত্রুটি বা অভিযোগে শিক্ষার্থীদের বাবা-মাকে স্কুলে ডেকে প্রকাশ্যে অপমান করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে। পরিচালক মাসুদ রানা লিটনের বিরুদ্ধে অশালীন ভাষা ব্যবহার, কটূক্তি এবং শিক্ষার্থীদের হেয় করে কথা বলার অভিযোগও তুলেছেন অনেকেই।অভিযোগের তালিকায় উঠে এসেছে শিক্ষিকা মাহমুদা ম্যাডাম, সানজিদা ম্যাডাম ও রিফাত ম্যাডামের নামও। স্থানীয়দের দাবি, কিছু শিক্ষক-শিক্ষিকা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে এমন আচরণ করতেন যেন তারা কোনো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নয়, বরং মানসিক শাস্তির কারখানায় অবস্থান করছে।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ,কথায় কথায় টিসি দেওয়ার হুমকি, ক্লাসে অপমান, সহপাঠীদের সামনে হেয় করা এবং অভিভাবকদের ডেকে চাপ প্রয়োগ ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে ‘সমস্যাজনক ছাত্র/ছাত্রী হিসেবে চিহ্নিত করা হতো বলেও অভিযোগ উঠেছে।
কিছু শিক্ষার্থী দাবি করেছে,শারীরিকভাবে লাঞ্ছনার ঘটনাও ঘটেছে বিভিন্ন সময়ে। তবে এসব অভিযোগের বিরুদ্ধে স্কুল কর্তৃপক্ষ এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেয়নি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিল সাবিকুন। সহপাঠীদের ভাষ্য, কয়েক সপ্তাহ ধরেই সাবিকুন অস্বাভাবিক চুপচাপ হয়ে পড়েছিল। পরিবারকেও একাধিকবার স্কুলে ডেকে অপমান করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে পরিবারে অশান্তি তৈরি হয় এবং মেয়েটি ধীরে ধীরে চরম হতাশা ও মানসিক বিপর্যয়ের দিকে চলে যায়।
স্থানীয়দের প্রশ্ন,একটি কিশোরী কেন আত্মহত্যার মতো ভয়াবহ সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হলো? কী এমন ঘটেছিল, যা তাকে জীবনের চেয়ে মৃত্যুকে সহজ মনে করিয়েছে?
সাবিকুনের মৃত্যুর ঘটনায় আজ ২১ মে সকাল থেকেই স্কুলের সামনে জড়ো হয় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। বিক্ষোভ, মানববন্ধন ও প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলনের সময় স্কুলের ভেতরে থাকা কোমলমতি শিশুদের গেট বন্ধ করে আটকে রাখা হয়, যা পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এখন ব্রাইট স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিরুদ্ধে বিস্ফোরক সব অভিযোগ ঘুরে বেড়াচ্ছে।অনেকে এটিকে শিক্ষার আড়ালে মানসিক নির্যাতনের সাম্রাজ্যবলেও মন্তব্য করছেন।
এ ঘটনায় শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়দের একটাই দাবি,সাবিকুনের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটনে অবিলম্বে নিরপেক্ষ তদন্ত করতে হবে। অভিযুক্ত পরিচালক ও শিক্ষিকাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবিও জানিয়েছেন তারা।অনেকেই বলছেন,একজন শিক্ষকের দায়িত্ব শিক্ষার্থীদের মানুষ করা, ভয় দেখানো নয়। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যদি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় না হয়ে আতঙ্কের জায়গায় পরিণত হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম কোথায় নিরাপদ থাকবে?সাবিকুনের মৃত্যু এখন শুধু একটি পরিবারের কান্না নয়,এটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় চলমান মানসিক নির্যাতন, অপমান ও ভয়ভীতির সংস্কৃতির বিরুদ্ধে এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ঘটনার পরও এখন পর্যন্ত প্রশাসনের দৃশ্যমান কঠোর পদক্ষেপ না থাকায় ক্ষোভ বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।এলাকাবাসীর প্রশ্ন,একজন শিক্ষার্থীর মৃত্যু কি শুধুই দুঃখজনক ঘটনা বলে চাপা পড়ে যাবে, নাকি সত্যিই বেরিয়ে আসবে পর্দার আড়ালের ভয়ংকর বাস্তবতা?সাবিকুনের মৃত্যুর সুষ্ঠু বিচার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক নির্যাতন বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি এখন সর্বত্র।